জুলাই স্মৃতি জাদুঘর: উদ্বোধনের আগেই প্রশ্ন
Banglabeacon.com – জ ল ই স ম ত জ – জুলাই গণ-অভ্যুত্থানের স্মৃতি ধারণের অন্যতম রাষ্ট্রীয় উদ্যোগ ‘জুলাই গণ-অভ্যুত্থান স্মৃতি জাদুঘর’-এর উদ্বোধন আগামী ৫ আগস্ট। প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান এই জাদুঘর উদ্বোধন করবেন। কিন্তু উদ্বোধনের আগেই নির্মাণ ব্যয়, সরঞ্জাম কেনা, নিয়োগ ও সরকারি অর্থ ব্যয়ের পদ্ধতি নিয়ে নানা প্রশ্ন উঠেছে। ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশ (টিআইবি) জাদুঘরের নির্মাণ ব্যয় ও ক্রয় পদ্ধতি নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেছে। শেরেবাংলা নগরে অবস্থিত ঐতিহাসিক গণভবনকে ঘিরে গড়ে উঠছে এই জাদুঘর।
নির্মাণ ব্যয় ও ক্রয় পদ্ধতি নিয়ে বিতর্ক
২০২৪ সালের ৫ আগস্ট ছাত্র-জনতার অভ্যুত্থানের পর গণভবনকে স্মৃতি জাদুঘরে রূপান্তরের সিদ্ধান্ত নেয় অন্তর্বর্তী সরকার। এরপর থেকে জাদুঘরটি ঘিরে তৈরি হয়েছে নানা আলোচনা-সমালোচনা। জাদুঘর নির্মাণকে ঘিরে বিতর্কের কেন্দ্রবিন্দুতে রয়েছে এর নির্মাণ ব্যয়, পরিচালনা কাঠামো এবং প্রকল্প বাস্তবায়নের পদ্ধতি। এই জাদুঘর নির্মাণ প্রক্রিয়াটি কোনো বিশেষায়িত ক্রয় নয়; বরং এ প্রকল্পে বিদ্যুৎ ও যান্ত্রিক (ইএম) এবং পূর্ত খাতের প্রায় ১১১ কোটি টাকার কাজ দুটি ভিন্ন প্রতিষ্ঠানকে সরাসরি দেওয়া হয়েছে।
টিআইবির উদ্বেগ ও অভিযোগ
কর্তৃপক্ষের এমন সিদ্ধান্তে গত ১৬ জুলাই এক বিবৃতিতে উদ্বেগ প্রকাশ করেছে টিআইবি। সংস্থাটির নির্বাহী পরিচালক ড. ইফতেখারুজ্জামান বলেন, ‘সরকারি অর্থ ব্যয়ের ক্ষেত্রে স্বচ্ছতা, প্রতিযোগিতা ও জবাবদিহির যে ন্যূনতম মানদণ্ড অনুসরণ করা উচিত, সরাসরি ক্রয় পদ্ধতির নামে বিদ্যমান সরকারি ক্রয়নীতি ও বিধান এড়িয়ে কাজ দেওয়ার ফলে তা প্রশ্নবিদ্ধ হয়েছে।’ বিভিন্ন গণমাধ্যমে প্রকাশিত অনুসন্ধানী প্রতিবেদনে নির্মাণ ব্যয়, বিল-ভাউচার, তথ্যচিত্র নির্মাণ, ভাস্কর্য, আপ্যায়ন ব্যয়, স্বেচ্ছাসেবকদের নামে অর্থ উত্তোলন, সরকারি ক্রয়বিধি অনুসরণ না করা এবং নিয়োগ প্রক্রিয়ার অনিয়মের অভিযোগ উঠেছে।
নিয়োগ ও তথ্য প্রদানে অনিয়ম
কিছু প্রতিবেদনে একই ধরনের কাজের জন্য একাধিক উৎস থেকে অর্থ ব্যয়ের হিসাব দেখানো এবং প্রতিযোগিতামূলক দরপত্র ছাড়াই নির্দিষ্ট প্রতিষ্ঠানকে কাজ দেওয়ার অভিযোগও করা হয়েছে। নিয়োগের ক্ষেত্রে বিজ্ঞপ্তি প্রকাশের আগেই মৌখিক পরীক্ষা, লিখিত পরীক্ষা ছাড়া নিয়োগের উদ্যোগ এবং সীমিত সময়ের আবেদন প্রক্রিয়া নিয়েও প্রশ্ন তোলা হয়েছে। তবে এসব অভিযোগের বিষয়ে এখন পর্যন্ত সরকারের পক্ষ থেকে কোনো তদন্ত হয়নি এবং কোনো অভিযোগ আনুষ্ঠানিকভাবে প্রমাণিতও হয়নি।
জাতীয় জাদুঘরের মহাপরিচালক তানজিম ওয়াহাব গণমাধ্যমে বলেছেন, প্রকল্পের সব কার্যক্রম সরকারি নিয়ম মেনেই সম্পন্ন হয়েছে। তার দাবি, নির্ধারিত সময়ে জাদুঘর উদ্বোধনের প্রয়োজনীয়তা রয়েছে। তাই কিছু প্রশাসনিক প্রক্রিয়া নিয়ে প্রশ্ন উঠতে পারে। তবে তা নিয়মবহির্ভূত ছিল না। তিনি আরও জানিয়েছেন, গণপূর্ত অধিদপ্তর এখনো প্রকল্পটি আনুষ্ঠানিকভাবে হস্তান্তর করেনি এবং পূর্ণাঙ্গ অডিটও শেষ হয়নি।
অর্থায়ন ও ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা
জুলাই স্মৃতি জাদুঘর প্রকল্পসংক্রান্ত তথ্য, নথিপত্র, ছবি ও ভিডিওগ্রাফি সংগ্রহে সাংবাদিকদের পর্যাপ্ত সহযোগিতা না করার অভিযোগ উঠেছে। ফলে তথ্য প্রদানে কর্তৃপক্ষের এমন রাখঢাক পুরো কার্যক্রমের স্বচ্ছতা নিয়ে বিতর্ককে উসকে দিয়েছে। জাতীয় জাদুঘরসহ সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের বিরুদ্ধে তথ্য প্রাপ্তিতে হরানি ও অসহযোগিতার অভিযোগ করেছেন বিভিন্ন সাংবাদিক। জাতীয় জাদুঘরের তথ্য অনুযায়ী, গণপূর্ত অধিদপ্তর ও জাতীয় জাদুঘর মিলিয়ে প্রকল্পটির জন্য ১২৩ কোটি ৪৫ লাখ টাকা বরাদ্দ দেওয়া হয়েছিল। এর মধ্যে ব্যয় হয়েছে ১১০ কোটি ৯২ লাখ টাকা এবং অব্যয়িত ১২ কোটি ৫৩ লাখ টাকা সরকারি কোষাগারে ফেরত দেওয়া হয়েছে।
প্রকল্প উদ্বোধনের সময় ঘনিষ্টে এলেও এখন পর্যন্ত স্থায়ী জনবল নিয়োগ হয়নি। প্রকল্পের পূর্ণাঙ্গ অডিটও শেষ হয়নি। জাতীয় জাদুঘর ও জুলাই স্মৃতি জাদুঘরের মহাপরিচালক তানজিম ওয়াহাব জানিয়েছেন, স্থায়ী জনবল নিয়োগ শেষ না হলেও নির্ধারিত সময়েই উদ্বোধন হবে। আপাতত জাতীয় জাদুঘরের ১৮ জন কর্মকর্তা অতিরিক্ত দায়িত্বে কাজ করছেন এবং পরবর্তী সময়ে আউটসোর্সিংয়ের মাধ্যমে প্রয়োজনীয় জনবল নিয়োগের পরিকল্পনা রয়েছে। ঐতিহাসিক গণভবনকে ঘিরে গড়ে ওঠা এই জাদুঘর একসময় ছিল সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার সরকারি বাসভবন। ২০২৪ সালের জুলাই গণঅভ্যুত্থানের পর এটি জনগণের জন্য উন্মুক্ত করার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়। কিন্তু উদ্বোধনের আগেই ব্যয় ও স্বচ্ছতা নিয়ে প্রশ্ন উঠা এই প্রকল্প এখন নতুন বিতর্কের মুখে পড়েছে।
