ইবোলার ভয়াবহতা প্রতিরোধে কী উপায়
Banglabeacon.com – ইব ল র ভয় বহত প রত – ইবোলা একটি মারাত্মক ভাইরাল রোগ যা মানুষের জীবনকে হুমকির মুখে ফেলতে পারে। এই রোগটি প্রতিরোধের জন্য সঠিক পদক্ষেপ নেওয়া অত্যন্ত জরুরি। ইবোলা ভাইরাস মূলত আফ্রিকার কিছু নির্দিষ্ট অঞ্চলে দেখা যায়, তবে এর প্রাদুর্ভাব বিশ্বব্যাপী উদ্বেগের বিষয় হয়ে দাঁড়িয়েছে। ইবোলার ভয়াবহতা প্রতিরোধে কী উপায় জানা প্রত্যেকের জন্য প্রয়োজনীয়। এই রোগটি ইবোলা ভাইরাস ডিজিজ সৃষ্টি করে, যা মানুষের পাশাপাশি বন্য প্রাণীকেও আক্রান্ত করতে পারে।
ইবোলা ভাইরাসের পরিচয় ও বৈশিষ্ট্য
রোগটি প্রথম শনাক্ত হয় ১৯৭৬ সালে আফ্রিকার বর্তমান গণতান্ত্রিক কঙ্গো প্রজাতন্ত্রে। ইবোলা নদীর কাছাকাছি একটি এলাকায় এই রোগটি প্রথম দেখা যায়। সেই নদীর নাম থেকেই রোগটির নামকরণ করা হয় ‘ইবোলা’। ইবোলা একটি ফিলোভাইরাস পরিবারের ভাইরাস। এর কয়েকটি ভিন্ন প্রজাতি রয়েছে, যার মধ্যে জায়ার, সুদান এবং বুন্ডিবুগিও উল্লেখযোগ্য। বিভিন্ন প্রজাতির কারণে রোগের তীব্রতা ও মৃত্যুহার কিছুটা ভিন্ন হতে পারে।
ইবোলা ভাইরাসের অভ্যন্তরীণ গঠনকে কয়েকটি প্রধান অংশে ভাগ করা যায়। জেনেটিক উপাদান হিসেবে এটি একটি এক-সূত্রক ঋণাত্মক-সংবেদনশীল RNA ভাইরাস। নিউক্লিওক্যাপসিড হলো RNA-কে ঘিরে থাকা প্রোটিনের প্রলেপ যা ভাইরাসের জেনেটিক তথ্যকে সুরক্ষা দেয়। লিপিড মেমব্রেন ভাইরাসটির বাইরের দিকে হোস্ট সেল থেকে প্রাপ্ত চর্বি বা লিপিডের একটি আবরণী থাকে। গ্লাইকোপ্রোটিন স্পাইক ভাইরাসটি মানুষের কোষকে আক্রমণ করতে সাহায্য করে। পলিমারেজ হলো ভাইরাসের প্রোটিন যা হোস্ট কোষের ভেতরে গিয়ে ভাইরাসের সংখ্যা বৃদ্ধিতে সাহায্য করে।
সংক্রমণের মাধ্যম ও উপসর্গ
ইবোলা কোনো বায়ুবাহিত রোগ নয়; এটি মূলত সংক্রমিত ব্যক্তি বা প্রাণীর শরীরের তরলের সরাসরি সংস্পর্শে এলে ছড়ায়। সাধারণত আক্রান্ত ব্যক্তির রক্ত, বমি, লালা, ঘাম, প্রস্রাব, মল ও বীর্যের মতো শারীরিক তরল কিংবা তাদের ব্যবহৃত কাপড়, বিছানা, সুচ ও অন্যান্য চিকিৎসা সরঞ্জামের মাধ্যমে এই ভাইরাসটি স্থানান্তরিত হতে পারে। এছাড়া ফলখেকো বাদুড় ও বানরের মতো আক্রান্ত বন্য প্রাণীর সংস্পর্শে আসা এবং নিরাপদ পদ্ধতি অনুসরণ না করে মৃত ইবোলা রোগীর দাফন বা সৎকারে অংশ নেওয়ার মাধ্যমেও সংক্রমণ ঘটার ব্যাপক ঝুঁকি থাকে।
ইবোলায় আক্রান্ত হলে কী হয় তা জানা জরুরি। ভাইরাস শরীরে প্রবেশের পর সাধারণত ২ থেকে ২১ দিনের মধ্যে উপসর্গ দেখা দেয়। শুরুতে এটি সাধারণ জ্বর বা ভাইরাল সংক্রমণের মতো মনে হলেও পরে দ্রুত গুরুতর আকার ধারণ করতে পারে। প্রাথমিক লক্ষণে রোগীর হঠাৎ উচ্চ জ্বর, তীব্র মাথাব্যথা, শরীর ও পেশিতে প্রচণ্ড ব্যথা, চরম দুর্বলতা ও ক্লান্তি এবং গলাব্যথা দেখা দেয়। মধ্যবর্তী লক্ষণে গ্যাস্ট্রোঅন্ত্রের নানান জটিলতা তৈরি হয়। গুরুতর জটিলতায় শরীরের রক্তনালী ও অভ্যন্তরীণ অঙ্গ ক্ষতিগ্রস্ত হতে থাকে।
চিকিৎসা ও প্রতিরোধ ব্যবস্থা
ইবোলা বিশ্বের সবচেয়ে প্রাণঘাতী সংক্রামক রোগগুলোর একটি। ভাইরাসের ধরন, চিকিৎসা সুবিধা এবং রোগী কত দ্রুত হাসপাতালে পৌঁছেছেন-এসবের ওপর মৃত্যুহার নির্ভর করে। কিছু প্রাদুর্ভাবে মৃত্যুহার ২৫% থেকে ৯০% পর্যন্ত ছিল। তবে বর্তমানে দ্রুত শনাক্তকরণ, উন্নত চিকিৎসা এবং নিবিড় পরিচর্যার কারণে অনেক রোগী সুস্থ হয়ে উঠছেন। বর্তমানে ইবোলা চিকিৎসার প্রধান লক্ষ্য হলো রোগীর জীবন রক্ষা করা এবং জটিলতা কমানো।
ইবোলার ভয়াবহতা প্রতিরোধে বেশ কিছু গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ গ্রহণ করা অত্যন্ত জরুরি। সংক্রমণ থেকে বেঁচে থাকতে নিয়মিত সাবান দিয়ে হাত ধোয়ার অভ্যাস গড়ে তোলার পাশাপাশি আক্রান্ত ব্যক্তি বা তাদের শরীরের তরলের সংস্পর্শ এড়িয়ে চলতে হবে। স্বাস্থ্যকর্মী ও সেবাদানকারীদের ক্ষেত্রে প্রয়োজন অনুযায়ী যথাযথ ব্যক্তিগত সুরক্ষা সরঞ্জাম ব্যবহার নিশ্চিত করা এবং যেকোনো আক্রান্ত রোগীকে দ্রুত আলাদা করে আইসোলেশনে রেখে চিকিৎসার ব্যবস্থা নেওয়া আবশ্যক। এছাড়া ইবোলার কিছু ধরন-বিশেষ করে ‘জায়ার’ প্রজাতির বিরুদ্ধে নির্দিষ্ট অ্যান্টিবডি-ভিত্তিক চিকিৎসা উদ্ভাবন সম্ভব হয়েছে। তবে সব ধরনের ইবোলা ভাইরাসের জন্য এখনো সমান কার্যকর ওষুধ বা টিকা পাওয়া যায়নি; বিশেষ করে ‘বুন্ডিবুগিও’ প্রজাতির জন্য নির্দিষ্ট চিকিৎসা ও কার্যকর টিকা নিয়ে বর্তমানে গবেষণা অব্যাহত রয়েছে।
