লোরকার দেশে: ভ্রমণ কাহিনির সীমানা অতিক্রম
Banglabeacon.com – ভ রমণ ক হ ন ক অত – রাজধানীর শুক্রবারের ছুটির দিনে হালকা বৃষ্টির ফোঁটা টিপ টিপ করে পড়ছিল। আষাঢ়ের ভারী বর্ষণের পরেই এই মৃদু বৃষ্টিপাত। নাগরিকমনে তখন পরম স্বস্তির ভেজা স্নিগ্ধতা। সম্ভবত ঘরে ঘরে রান্না চলছিল ভোনা খিচুড়ি, বেগুনভাজি, মাছভাজি বা মাংসের রেসিপি। কেউ কেউ আহার শেষে বিশ্রাম নিতে চাইবেন—এটাই তো স্বাভাবিক। কিন্তু গত ১০ জুলাই ২০২৬ তারিখের সেই শুক্রবারটি ছিল কিছুটা ভিন্ন।
রাজধানীর একাংশের সাহিত্য ও বইপ্রেমী মানুষ ছুটে এসেছিলেন সাহিত্য, বই, লোরকা, শালুক এবং লেখক চৌধুরী সালাহউদ্দীন মাহমুদের টানে। বাংলা একাডেমির শামসুর রাহমান মিলনায্যতনে এই সমাবেশ অনুষ্ঠিত হয়েছিল। উদ্দেশ্য ছিল ‘শালুক’ থেকে প্রকাশিত চৌধুরী সালাহউদ্দীন মাহমুদের ‘লোরকার দেশে’ ভ্রমণগ্রন্থ নিয়ে শুভেচ্ছা সমাবেশ ও আলোচনা।
অতিথি ও আলোচকবৃন্দ
অনুষ্ঠানটি ছিল বিকাল চারটায়। দেশের নবীন ও প্রবীণ সাহিত্যিক ও সাংস্কৃতিক ব্যক্তিত্বগণ ছিলেন আলোচক। মুখ্য আলোচক হিসেবে ছিলেন সাংবাদিক, কবি ও সম্পাদক সোহরাব হাসান। কবি প্রাবন্ধিক অনুবাদক কুমার চক্রবর্তী ও রাজু আলাউদ্দিন, কবি ও অনুবাদক মাহফুজ আল-হোসেন, অনুবাদক সুরাইয়া ফারজানা হাসান, সাংস্কৃতিক ব্যক্তিত্ব মুজতবা রেজা, মোহাম্মদ ওবাঈদুল্লাহ, আশরাফ উদ্দিন আহমদ এবং গ্রন্থ রচয়িতা কবি প্রাবন্ধিক সম্পাদক চৌধুরী সালাহউদ্দীন মাহমুদ—সবাই ছিলেন আলোচক। ‘সংবাদ’-এর সাহিত্য সম্পাদক ও ‘শালুক’-এর সম্পাদক কবি ওবাঈদ আকাশের সঞ্চালনায় বিকাল সাড়ে চারটায় শুভেচ্ছা জ্ঞাপনের ভিতর দিয়ে শুরু হয়েছিল মূল পর্ব।
বহুমাত্রিক গ্রন্থ হিসেবে ‘লোরকার দেশে’
আলোচনায় প্রতিটি বক্তার বক্তব্যে যে সারকথাটি উঠে এসেছে, তা হলো ‘লোরকার দেশে’ ভ্রমণ কাহিনিটি শুধুমাত্র একটি ভ্রমণ কাহিনি নয়; এটি একটি বহুমাত্রিক গ্রন্থ। ইতিহাস, ঐতিহ্য, কবিতা, গবেষণা, সমালোচনার মিশেলে গ্রন্থটি রূপ নিয়েছে একটি অনন্য জ্ঞান ও জানার আকর হিসেবে। আলোচনায় আরও উঠে এসেছে লেখক-সম্পাদক চৌধুরী সালাহউদ্দীন মাহমুদের জন্মগত সাহিত্যবোধ, সাহিত্যের প্রতি প্রগাঢ় নিষ্ঠা, মহত্তর মানসিকতা ও অমায়িক-বন্ধুবৎসল সব গুণাবলি।
চৌধুরী সালাহউদ্দীন মাহমুদের ‘লোরকার দেশে’ কেবল একটি ভ্রমণ কাহিনি নয়, এটি একই সঙ্গে ভ্রমণ, সাহিত্য সমালোচনা, সাংস্কৃতিক ইতিহাস, নন্দনতত্ত্ব এবং এক মহান কবির জীবনদর্শনের অনুসন্ধান। বইটি স্পেনের আন্দালুসিয়ার লোরকার পদচিহ্ন অনুসরণ করতে করতে স্পেন ছাড়িয়ে লোরকার স্মৃতিধন্য কয়েকটি দেশে ও শহরে—নিউ ইয়র্ক, হাভানা ও বুয়েনোস আইরেসে, কবির অনূদিত কবিতা, অসংখ্য লেখা, শিল্পকর্মে, অগণিত মূল্যবান তথ্যসূত্রের মধ্য দিয়ে বৌদ্ধিক যাত্রায় পাঠককে আমন্ত্রণ জানায়, যেখানে ভূগোল ধীরে ধীরে রূপ নেয় কাব্যভূমিতে, আর ভ্রমণ রূপান্তরিত হয় এক নান্দনিক ও দার্শনিক অন্বেষণে। লেখক স্পেনের গ্রানাদা, ফুয়েন্টে বাকেরোস, লোরকা সেন্টার কিংবা আন্দালুসিয়ার প্রকৃতিকে পাঠ করেছেন লোরকার কবিতার প্রতীকতত্ত্বের আলোকে। ফলে প্রতিটি স্থান যেন লোরকার একটি কবিতার ব্যাখ্যায় পরিণত হয়েছে। এই অর্থে গ্রন্থটি একটি Literary Pilgrimage অর্থাৎ সাহিত্যিক তীর্থযাত্রা। লোরকার নন্দনতত্ত্বের সবচেয়ে মৌলিক ধারণা দুইটি। সালাহউদ্দিন মাহমুদ এই দুইটির ধারণাকে ভ্রমণের অভিজ্ঞতার সঙ্গে মিলিয়ে দেখিয়েছেন। আন্দালুসিয়ার রোদ, শুষ্কতা, পাহাড়, ফ্লামেঙ্কোর ব্যথাভেজা সুর—সবকিছুই যেন দুইটির অভিব্যক্তি। গ্রন্থটিতে লেখক লোরকা সেন্টারের বিবরণের মধ্য দিয়ে এই মহান কবির পাণ্ডুলিপি, চিত্রকর্ম, সংগীতচর্চা ও নাট্যচর্চার তথ্য পাঠককে পৌঁছে দেওয়ার প্রয়াস পেয়েছেন। এই গ্রন্থের অন্যতম নন্দনতাত্ত্বিক বৈশিষ্ট্য হলো—Poetics of Place। আন্দালুসিয়ার জলপাই বাগান, সিয়েরা নেভাদা, জিপসি পল্লী, গ্রানাদার অলিগলি, আরব স্থাপত্য, ফ্লামেঙ্কোর মঞ্চ—সবকিছুই লেখকের বর্ণনায় লোরকার কবিতার প্রতীকে রূপান্তরিত হয়েছে। ‘লোরকার দেশে’ মূলত এক নন্দনতাত্ত্বিক ভ্রমণ। এটি এমন একটি গ্রন্থ, যেখানে পথের বর্ণনা অপেক্ষা পথের অন্তর্নিহিত অর্থ অধিক গুরুত্বপূর্ণ। ফলে ‘লোরকার দেশে’ একটি সাধারণ ট্রাভেলগ নয়; এটি বাংলা ভাষায় লোরকা-চর্চার একটি গুরুত্বপূর্ণ সংযোজন। গ্রন্থটির মূল লক্ষ্যই লোরকার জীবন, কবিতা ও স্পেনের ভূগোলকে একাকার করে দেখা।
‘লোরকার দেশে’ বইটি হয়ে উঠেছে সাহিত্যের এক তীর্থ যাত্রা। সাধারণ ভ্রমণ কাহিনিতে আমরা পথের বর্ণনা, দর্শনীয় স্থানের বর্ণনা পাই; কিন্তু লেখক যে যাত্রা করেছেন এই বইটিতে সেটি একই সঙ্গে ভৌগোলিক, সাংস্কৃতিক এবং কাব্যিক। তিনি আমাদের নিয়ে গেছেন এমন একটি ভূখণ্ডে, যেখানে ইতিহাস, সংস্কৃতি, সঙ্গীত, স্থাপত্য এবং কাব্য—পরস্পর এমনভাবে মিশে আছে যে, একটি থেকে আরেকটিকে আলাদা করা যায় না। আমি বইটির পর্যালোচনায় না গিয়ে স্পেনের আন্দালুসিয়া এবং গ্রানাডা কীভাবে একটি অনন্য সাংস্কৃতিক ভূমি হয়ে উঠেছে এবং সেখানে কীভাবে ফেদেরিকো গার্সিয়া লোরকার মতো একজন কবির জন্ম হয়েছে সেদিকটাতে আলোকপাত করতে চাই। কোনো কবিকে বুঝতে হলে তার অর্থনৈতিক, সামাজিক ইতিহাস ও তার ভৌগোলিক অবস্থান সম্পর্কে জানতে হয়। একজন কবি শূন্যে জন্ম নেন না; তিনি প্রকৃতির সন্তান, মাটির সন্তান। আমরা জানি, আন্দালুসিয়ার রোমান সভ্যতা এসেছে, ভিসিগথদের শাসন এসেছে। তারপর প্রায় আটশ বছর ধরে ইসলামিক সভ্যতার বিকাশ ঘটেছে। তারপর
