রক ব ল হ স ন র – সময় ও স্রোত কারো জন্য অপেক্ষা না করলেও সাহিত্যিকের কলমে তার নব প্রাণ উদ্দীপিত হয়| কারণ লেখক তাঁর অদম্য শক্তি দিয়ে সময়ের ছবি আঁকার চেষ্টা করেন| যার ফলে শিল্প-সাহিত্যে সময় খুব গুরুত্বপূর্ণ| সাহিত্যিক-মহল সময়কে বাঁচিয়ে রাখে তাঁদের কর্মে| আর তাই সময়ের অমোঘ ঘোর সহিত্যকে পেলবতা দান করে| এই পেলবতার পেখম তলে রঙবেরঙে জীবনের চিত্র ছড়িয়ে-ছিটিয়ে থাকে| পাশাপাশি উঠে আসে ব্যক্তিজীবন, সামাজিক জীবন, রাষ্ট্রীয় ও রাজনৈতিক অনুষঙ্গ, আর্ন্তজাতিক চেতনা, মানুষ-প্রকৃতি ও প্রেমের মেলবন্ধন| কারণ, ‘সমাজের উপর সাহিত্যের প্রভাব হিতকর এবং অহিতকর উভয়ই হতে পারে এই কারণে লেখক তাঁর রচনার সামাজিক ফলশ্রুতি সম্পর্কে উদাসীন থাকতে পারে না|’ (সমাজ ও সাহিত্য) এসব চেতনার পরিপূর্ণ সম্মিলন ঘটেছে কবি রকিবুল হাসান (জন্ম. ১৯৬৮)-এর কাব্য পরিক্রমায়| তাঁর কাব্যগ্রন্থগুলোর মধ্যে রয়েছে: অনিয়ম চুম্বনের সিঁড়ি ধরে (১৯৯১), একধরনের অহংকার (১৯৯৮), দুঃখময়ী শ্যামবর্ণ রাত (২০০৮), দেবতীদেউল (২০১২), রহস্য স্বাক্ষর (২০১৩), ব্যর্থ ভয়ংকর দৌড়ের কাছে (২০১৬), বুলবুলবেদনাকাব্য (২০২০), জলের গোপন গল্প (২০২২), মাজিভাই (২০২৪)| এসব কাব্যগ্রন্থে কবির কল্পনাশক্তি-বাস্তবতা ও সময়ের রেখাচিত্রের অপূর্ব যোগসূত্র স্থাপিত হয়েছে| যার ফলে শরতের কোমল কাশের শুভ্রতা হৃৎস্পন্দনে যুক্ত হয়েছে| অনিয়ম চুম্বনের সিঁড়ি ধরে কাব্যগ্রন্থের প্রথম কবিতা ‘অদ্ভুত আঁধার’| কবিতায় কবি রকিবুল হাসান সময়ের চিত্র এঁকেছেন| তিনি যে মায়ের বেদনাজর্জর মূর্তি নির্মাণ করেছেন, তা দেশমাতার| এই দেশমাতা আজ কাঁদছে| পাশাপাশি কাঁদছে তার সন্তানের আটাশ কোটি পায়ের শব্দ! আজন্ম যে সবুজ-শ্যামল-শস্য ভরা দেশে মানুষেরা স্বপ্ন বুনেছিল তা আজ মিথ্যা!
সময়ের সঙ্গে সঙ্গে শৈশব-কৈশোরের আঁতুড়ঘর, খেলার রঙিন মাঠ, গৌরিতীর, নৌকার পাহাড়ি ছই, সন্ধ্যার মায়াবী আকাশ সবই বিস্মৃতির গর্ভে বিলীন হচ্ছে| সোনালি জমিনে বিষাক্ত সাপের মতো দানবেরা কিলবিল করছে! সেইসঙ্গে লুটেপুটে নিচ্ছে মায়ের শরীর! তাই কবি মায়ের এই হাহাকারকে কবিতায় দেখানোর চেষ্টা করেছেন| মা’ কবিতাটিতে কবি হৃদয়ের আর্তনাদ প্রকাশিত হয়েছে| সন্তানের শ্রেষ্ঠ সম্পদ তাঁর মা| মা-হীন সন্তান বানে ভেসে যাওয়া কুটোর মতো| যার কোনোই আশ্রয় নেই!
হৃদয়ের কান্না লুকানোর এই স্পর্শকে কবি খুঁজে ফিরেছেন| সেই মা আজ পৃথিবীতে নেই! কিন্তু রয়ে গেছে তার হাজারো স্মৃতি| সেই স্মৃতির ঝাপটায় কবিমন চঞ্চল| ঈদের ছুটিতে মায়ের জন্য জামরঙের শাড়ি নিয়ে বাড়ি ফেরার বাসনা থাকলেও আজ সবই কল্পনা! একসময় মা শত বায়না পূরণ করলেও আজ তিনি শুধুই আর্তনাদে গেঁথে আছেন| মূলত মায়ের মৃত্যুর মধ্য দিয়ে কবির সব স্বপ্ন দপ করে নিভে গেছে| কবি রকিবুল হাসানও নক্ষত্রলোকের মধ্যে ‘আপনার হৃদয়কে অনুভব’ করেন| তাই নিজেকে অনুভব ও সেই অনুভবকে দশজনের কাছে চারিয়ে দেওয়ার জন্য তিনি প্রয়োগ করেছেন নিজ¯^ ভাষাশৈলী| তিনি যেভাবে অন্তর্লীন মাতৃকাতন্ত্রের বাহুডোরকে ব্যক্ত করেছেন তা একান্তই কবির হৃদয়ের হাহাকার!
তার ‘রাতের কান্না’ কবিতায় অচরিতার্থ জীবনের চিত্র প্রকাশ পেয়েছে| সঙ্গী হারানোর বেদনায় প্রেমিক যেমন জর্জরিত তেমন পাখিও| প্রিয়তমের বিচ্ছেদে মানবমন চঞ্চল হয়| আর পাঁজর ভাঙা কান্নায় রাত ভার হয়ে আসে| প্রেমিকের প্রেমহীন চিত্ত শুষ্ক মরুভূমির বুকে প্রখর সূর্যের উত্তাপ্ত বালুকারাশি! প্রেম মানবমনকে যেমন শীতল করে, স্বস্তি দেয় ঠিক বিচ্ছেদে রাতকে দীর্ঘ করে| ‘দুঃখময়ী শ্যামবর্ণ রাত’ কাব্যগ্রন্থের ‘সিডর’ কবিতায় কবি ২০০৭ সালের ১৫ নভে¤^রে দেশের দক্ষিণাঞ্চলের ওপর দিয়ে বয়ে যাওয়া স্মরণকালের ভয়ঙ্কর ঘূর্ণিঝড় সিডরের দুঃসহ স্মৃতিকে ব্যক্ত করেছেন| ‘জীবন তো একটা ফুটো বেলুন’ কবিতায় কবির জীবনোপলব্ধি প্রকাশিত হয়েছে| জীবন সম্পর্কে দৃশ্যত কবি এখানে নেতিবাচক দৃষ্টির প্রকাশ করলেও কার্যত দার্শনিক উপলব্ধি ব্যক্ত করেছেন| জীবন প্রতিনিয়ত পরিবর্তনশীল| আর পরিবর্তনের জোয়ারে কেউ হয় ক্ষতবিক্ষত আবার কেউবা ঘুরে দাঁড়ায় ভাঙা পালে হওয়া লাগিয়ে| জীবনের এই বিচিত্র বিস্ময়ের গোলকধাঁধায় মানব তবু থেকে যায়| দেবতীদেউল (২০১২) কাব্যগ্রন্থের ‘ভুল শাড়ি’ কবিতায় জীবনের কঠিন রূপ সম্পর্কে উপলব্ধি প্রকাশ পেয়েছে| কবি জীবনের ভুলই বড় হয়ে দেখা দিয়েছে এই কবিতায়| প্রিয়তমাকে ভালোবেসে কাছে টেনে কবি যে ভুল করেছেন, তা তাঁর হৃদয়কে ক্ষতবিক্ষত করে দিচ্ছে| একসময় সুগন্ধি কালো কুচকুচে চুলের অন্ধকারে কবি হৃদয়ের ঢেউ খেলে যেতো, আজ প্রিয়াবিচ্ছেদে কবির বুকে জেগে উঠছে একখণ্ড কষ্ট-কালো মেঘ! কবি রকিবুল হাসান তাঁর মানসপ্রিয়াকে শতরূপে নিজের করে পেতে চান| তিনি কোনো কিছুর হিসাব মেলাতে নারাজ| শুধু চান ফুটন্ত গোলাপের পাপড়ি হয়ে যেন কবিহৃদয়ে সুগন্ধি ঢেলে যায় তাঁর দেবতী| এ দেবতীকে কল্পনার রঙেই শতসহস্র মণিমাণিক্য ও ভালোবাসার মালায় গেঁথেছেন| যুগে যুগে কবিরা তাঁদের প্রেয়সীকে কল্পনার রাজ্যের পরী রূপে সাজিয়েছেন| তাকে ভেঙেছেন-গড়েছেন নিজের মতো করে| মানুষকে ভেঙে নতুন রূপে গড়তে পুরোপুরি সক্ষম না হলেও কল্পনার রানিকে রাঙানো যায় ব্যক্তির আবেগ ও আকাঙ্ক্ষা অনুযায়ী| তাই এই কল্পরানিরা নির্মল-সুন্দর-দেবী| রহস্য স্বাক্ষর কাব্যের ‘দূরত্ব’ কবিতায় মানবজাতির সম্পর্কে নানামাত্রিক চিত্র প্রকাশিত হয়েছে| কবির চেতনায় যে মানসপ্রিয়ার ছবি আঁকা, সেই প্রিয়া এক ‘দূরতম দ্বীপ’| তাকে ধরা যায় না| সে নিজের মনেও এক অজনা চরিত্র!
মাটির আঁচল’ কবিতায়ও কবির মাকে খুঁজে ফেরার প্রবল তৃষ্ণা হৃদয়জুড়ে! মা হারানোর বেদনা কবি কিছুতেই ভুলতে পারেন না তাই তার কবিতায় বারবার উঠে এসেছে মায়ের মুখ| পরম মমতায় আগলে রাখার কাতরতা| যে মা দশ মাস তাকে গর্ভে ধারণ করে পৃথিবীর আলো-বাতাস দেখিয়েছেন সেই মাকে ছাড়া কবিজীবন শূন্য-নিঃসঙ্গ| কাতর পাখিটির মতো তাইতো তিনিও বেদনায় নীল| কবির বুকের পাঁজর ভেঙে যাওয়ার বেদনা পৃথিবীময়| মায়ের পরম আগলে রাখা পরশের হাত তার মাথা থেকে সরে গেছে| মা এখন অনেক দূরের| কবির গ্রাম কয়া| সেখানের কাদামাটিকে পর্যন্ত কবি দুহাত দিয়ে আগলে রাখেন| কারণ এই মাটি তার মায়ের আরেক রূপ| মা ও মাটিকে তিনি তাই ভিন্ন দৃষ্টিতে দেখেননি| কী ব্যাকুলতা তার প্রাণে| তাই বারংবার ছুটে যান মা ও মাটির টানে| ‘মানুষের কীসে সুখ কীসে আনন্দ’ কবিতায় জীবন সম্পর্কে কবির দৃষ্টিভঙ্গি প্রস্ফুটিত হয়েছে| কবি মনে করেন, মানুষের জীবনে কিসে সুখ, কিসে আনন্দ সে নিজেই জানে না| এক অদ্ভুত জীবন নিয়েই মানুষের বেঁচে থাকা| কবি রকিবুল হাসান জানেন, জীবন এক অলিখিত মহাকাব্যের নাম| যার প্রতিটি পাতায় নতুন| ভোরের সূর্য যেমন একজন ছোট্ট শিশুর জন্য নতুন তেমনই একজন বয়োজ্যেষ্ঠ ব্যক্তির ক্ষেত্রেও নতুন| উভয়েই দিনটি নতুনভাবে শুরু করেন| তবু তাদের পথচলা এই মহাজীবনে| ক্ষণস্থায়ী জীবনে চলতে গিয়ে সুখের দেখা পেলেও দুঃখই চিরস্থায়ী| মানুষের সুখ যে আসলে কিসে তা কেউই বোঝে না| মানুষ যেমন নিজেকে বোঝে না, তেমনই সুখও বোঝার বাইরের এক মহত্তম অনুভূতির নাম| ‘একটুও ভালো নেই’ কবিতায় কবি স্মৃতি হাতড়েছেন| পরিবেশ-পরিস্থিতির পরিবর্তনে কবি মনে যে বেদনা সঞ্চার হয়েছে, তা-ই এখানে ব্যক্ত হয়েছে| রবীন্দ্রনাথ তাঁর ˆচতালী কাব্যের সভ্যতার প্রতি কবিতায় বলেছিলেন, ‘দাও ফিরে সে অরণ্য, লও এ নগর’| সৃষ্টিলগ্ন থেকেই মানুষ অরণ্যের সান্নিধ্যে জীবনযাপন করে| তখন থেকেই অরণ্য মানুষকে সস্নেহে লালন-পালন করার ভার তার নিজের ওপর নিয়েছে| কিন্তু আজ সে অরণ্যনীলিমা কোথায়? সেই পুরনো জীবনাচরণ কোথায়!
সবুজ-শ্যামল বাংলা যেমন এখন নেই তেমনই নেই গ্রামীণ প্রকৃতি-পরিবেশ| ইট-পাথরের নগরে মানবমনেও ঠাঁই নিয়েছে কাঠিন্যের| এখন পুরনা গল্পের জীবন নেই| সবাই যান্ত্রিক যুগে যন্ত্রচালিত মানবে পরিণত হয়েছে| রান্নাঘরের ভাঙা জানালায় চড়ুইপাখি, কবুতর-শালিখের খুনসুটি নেই| কাঁচামাটি দূরের গাঁয়ের পথের চিত্র আজ ধোঁয়াশা| হাওড়-বাওড়, বিল-ঝিল, মাঠ ভর্তি থই থই পানি সবই যেন এক অতীতকাহন| জলের গোপন গল্প (২০২২) কাব্যের ‘কোথাও ঠিকানা নেই’ কবিতায় কবির মৃত্যুচেতনা স্থান পেয়েছে| মৃত্যুই চিরন্তন| মৃত্যুই সর্বসত্য| ফলে মৃত্যুর সিঁড়ি বেয়ে জীবনের অবসান ঘটে| আর এই অবসানেই মানবের মুক্তি| মাজিভাই কাব্যের নামকবিতায় কবি আঞ্চলিক ভাষার সংমিশ্রণে ব্যক্তিগত আবেগ-অনুভূতিকে শব্দে রূপ দিয়েছেন| কবি ভাইদের মধ্যে মেজো| তিনি যখন তাঁর শৈশব-কৈশোর বিজড়িত মায়াময় গ্রাম কয়ায় উপস্থিত হন, তখন তাঁকে এভাবেই সম্বোধন করেন তার ভাই-সব| শৈশব-কৈশোরের দুরন্তপনার সাক্ষী যে গ্রাম, তা কবিকে বিমোহিত করে রাখে আজও| তিনি এর সৌন্দর্যময়তায় মুগ্ধ| ফেলে আসা স্মৃতিকে জাগিয়ে তুলতেই যেন কবির এই নিবেদন| মাজিভাই কি সত্যি ভুলতে পেরেছেন তাঁর মায়ের শরীরের ঘ্রাণমাখা খাট, বিস্তীর্ণ মাঠের পর মাঠ, সদরপুরের বিল, রবিঠাকুরের শ্যামা নায়িকার গল্প, শিলাদি, শামুক খেলায় মেতে ওঠার কথা| রকিবুল হাসানের কবিতায় দেশপ্রেম, মা-মাটি, নারী, মৃত্যুচেতনা, অস্তিত্বের লড়াই, সমকালীন জীবনযাত্রা ও সামাজিক দ্বন্দ্ব-সংকট-অবক্ষয়ের চিত্র, সংগ্রামের সামগ্রিক চিত্র প্রতিফলিত হয়েছে| কবি রকিবুল হাসান স্বচক্ষে যা দেখেছেন, তা-ই কবিতায় মালা আকারে গেঁথেছেন নিপুণ শব্দনৈপুণ্য| তাঁর এই শব্দের শিল্পমাল্য পাঠকমনকে আন্দোলিত করে অনায়াসেই| অলঙ্কারের সুষমা, বাকনৈপুণ্য, বুননকৌশল আর সজাগ দৃষ্টির আঙিনায় ধরা দিয়েছে মানবজীবনের পরিপূর্ণ চিত্র| তাই কাব্যজগতে তিনি নমস্য এবং কালের যাত্রার প্রবাদপ্রতিম ব্যক্তিত্ব|