ক্ষমতার কেন্দ্র থেকে প্রান্তের মানুষ আসলে কতটা দূরে?
ক ষমত র ক ন দ র - ভোটের দিনে দীর্ঘ লাইনে ভোটারদের দেখলে আমরা সাধারণত খুশি হই। অনেকে এই স্বতঃস্ফূর্ত ভোটদানকে গণতন্ত্রের প্রকৃত সৌন্দর্য হিসেবে আখ্যায়িত করেন।
Table of Contents
প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর প্রতিনিধিত্ব: ক্ষমতার কেন্দ্র থেকে কত দূরে?
Banglabeacon.com – ক ষমত র ক ন দ র – ভোটের দিনে দীর্ঘ লাইনে ভোটারদের দেখলে আমরা সাধারণত খুশি হই। অনেকে এই স্বতঃস্ফূর্ত ভোটদানকে গণতন্ত্রের প্রকৃত সৌন্দর্য হিসেবে আখ্যায়িত করেন। কিন্তু প্রশ্ন জাগে—গণতন্ত্রের আসল মূল্য কি শুধু ভোটারদের দীর্ঘ লাইন? না। সমাজের প্রতিটি নাগরিকের রাষ্ট্র পরিচালনায় সমান অংশীদারিত্ব নিশ্চিত হওয়ার মধ্যেই গণতন্ত্রের প্রকৃত সৌন্দর্য লুকিয়ে থাকে। নাগরিকের পরিচয়, শ্রেণী, ধর্ম, জাত বা পেশা নির্বিশেষে সমান সুযোগ, মর্যাদা ও ক্ষমতায়নই গণতন্ত্রের সার কথা। সংবিধান আমাদের সেই স্বপ্নই দেখিয়েছে। কিন্তু বাস্তবতার আয়নায় দাঁড়ালে প্রশ্ন জাগে: ক্ষমতার কেন্দ্র থেকে প্রান্তের মানুষ ঠিক কতটা দূরে?
এই প্রশ্নটিকে কেবল তাত্ত্বিক হিসেবে নয়, ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতার বিষয় হিসেবেও আমি দেখছি। ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে একজন প্রার্থী হিসেবে নির্বাচনী মাঠে কাজ করার সুযোগ আমাকে বাংলাদেশের গণতন্ত্রকে একেবারে ভেতর থেকে দেখার সুযোগ দিয়েছে। আমি উপলব্ধি করেছি, নির্বাচন কেবল ভোটের প্রতিযোগিতা নয়; এটি সমাজের ক্ষমতার কাঠামো, বৈষম্য, প্রতিনিধিত্ব এবং নাগরিক মর্যাদারও একটি প্রতিফলন।
প্রার্থী হওয়ার সিদ্ধান্ত: ব্যক্তিগত উচ্চাকাঙ্ক্ষা নয়, একটি সামাজিক দায়িত্ব
গত সংসদ নির্বাচনে আমি কেবল একজন প্রার্থী ছিলাম না; আমি এমন লাখ মানুষের আকাঙ্ক্ষার প্রতীক ছিলাম, যাদের কণ্ঠ সংসদের দরজায় পৌঁছায়নি। কোনো ব্যক্তিগত পদ-পদবীর আকাঙ্ক্ষা থেকে আমার প্রার্থী হওয়ার সিদ্ধান্ত আসেনি। দীর্ঘদিন ধরে দলিত ও বঞ্চিত জনগোষ্ঠীর অধিকার নিয়ে কাজ করতে গিয়ে আমি উপলব্ধি করেছি, নীতিনির্ধারণের টেবিলে আমাদের কণ্ঠস্বর না থাকলে অনেক গুরুত্বপূর্ণ সমস্যা বারবার উপেক্ষিত থেকে যায় (কখনোবা যেভাবে চাই সেভাবে উপস্থাপন করা হয় না)।
দলিত ও প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর একজন প্রতিনিধি হিসেবে আমি অনুভব করেছি, আমাদের নিয়ে অনেক আলোচনা হয়, কিন্তু আমাদের সঙ্গে আলোচনা খুব কম হয়। একইভাবে আমাদের জন্য নীতি তৈরি হয়, কিন্তু নীতিনির্ধারণে আমাদের অংশগ্রহণ সীমিত। মূলত এই বাস্তবতাই আমাকে নির্বাচনে অংশ নেওয়ার নৈতিক শক্তি জুগিয়েছে। আমার বারবারই মনে হয়েছে, বাংলাদেশের রাজনীতিতে ও সরকারে প্রান্তিক জনগোষ্ঠী অনুপস্থিত। ‘অন্তর্ভুক্তি’ শব্দটি মনে হয়: কাজীর গরু কিতাবে আছে, গোয়ালে নাই। সবখানেই কেমন যেন প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর অস্তিত্ব অস্বীকার বা স্বযত্নে এড়িয়ে যাওয়ার বিষয়টি পরিলক্ষিত হয়েছে।
স্বাধীনতার এতটা বছর পরেও ‘যেই লাউ সেই কদু’ টাইপের ভূমিকা আমাদের হৃদয়ে রক্তক্ষরণ ঘটিয়েছে। আসলে সেই রক্তক্ষরণের ক্ষত থেকেই নির্বাচনে প্রার্থী হওয়ার অদম্য ইচ্ছে।
নেপালের প্রেক্ষিত ও রাজনৈতিক ক্ষমতায়নের গুরুত্ব
তারও আগের প্রেক্ষিত যদি উল্লেখ করতে হয়, তবে সেটি নেপালে। ২০২৪ সালে বিরতিহীনভাবে নেপালের দলিত বিষয়ক গবেষণার কাজে মধেশ প্রদেশসহ বিভিন্ন স্থানে ভ্রমণসহ অধ্যয়নের সুযোগ হয়েছিল। কাজের অংশ হিসেবে পরিচয় হয় ‘বহুজন একতা পার্টি-নেপাল’ এর অধ্যক্ষ হরিনন্দন আম্বেদকর এবং সচিব জিতেন্দ্র রামের সঙ্গে। এর আগে অবশ্য ভারতের উত্তর প্রদেশের বহিন মায়াবতীর নেতৃত্বাধীন ‘বহুজন সমাজ পার্টি’ ও বাবা সাহেব আম্বেদকরের আদর্শে পরিচালিত ‘রিপাবলিকান পার্টি অব ইন্ডিয়া (আরপিআই)’ এর বিষয়ে জানার আগ্রহের জায়গা থেকে কিছুটা ধারণা ছিল।
মোদ্দাকথা, উপমহাদেশের তফসিলি, আদিবাসী, দলিতসহ অন্য অনগ্রসর অংশের রাজনৈতিক ক্ষমতায়ন সংশ্লিষ্ট বিষয়ে আমার ব্যাপক আগ্রহ কাজ করে বরাবরই। যাহোক, ললিতপুরে সাক্ষাৎকালে হরিনন্দন বাবু বাংলাদেশে দলিত আন্দোলনের বিষয়ে আমার কাছ থেকে জানতে চাইলে মোটামুটি একটা ধারণা দিই। লম্বা আলাপ শেষে তিনি বলেন,
প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর উন্নয়ন কেবলমাত্র রাজনৈতিক ক্ষমতায়নের মাধ্যমেই সম্ভব। সামাজিক, ধর্মীয় বা সাংস্কৃতিক সংগঠন দিয়ে নয়।
এই কথাটিই বারংবার আমার মাথা ঘুরতে থাকে।
আসলেই তো, সামাজিক সংগঠন দিয়ে সামাজিক কর্মকান্ড পরিচালনা করা যায়। ধর্মীয় সংগঠনের কাজ ধর্মীয় মূল্যবোধ সমুন্নত রেখে আধ্যাতিকতার চর্চা। আর সাংস্কৃতিক সংগঠন সংস্কৃতির বিকাশ ও প্রসারে ভূমিকা রাখে। কিন্তু রাজনৈতিক ক্ষমতায়ন ছাড়া বলা চলে সব উদ্যোগই অসাফল্য, বৃথা। একমাত্র রাজনৈতিক ক্ষমতায়নের জায়গায় পৌঁছাতে পারলেই কেবলমাত্র রাষ্ট্রীয় গুরুত্বের অংশ হওয়া যায়, অধিকার প্রতিষ্ঠার পাশাপাশি জীবনমানের প্রকৃত উন্নয়ন হস্তগত হয়। রাষ্ট্রযন্ত্রের দৃষ্টিতে আসা যায়। কিন্তু বাংলাদেশের বাস্তবতা ভিন্ন।
বাংলাদেশের প্রান্তিক জনগোষ্ঠী ও সংসদীয় প্রতিনিধিত্ব
প্রতিবেশি দেশ যখন তফসিলি জনগোষ্ঠীর অনুপাতিক প্রতিনিধিত্ব বা অন্তর্ভুক্তিমূলক রাজনৈতিক ব্যবস্থা, কোটা প্রবর্তন, সংখ্যালঘু কমিশন/ সেল/ মন্ত্রণালয় চলমান রেখেছে, ঠিক সেই সময়ে বাংলাদেশে স্বীকৃতি ও অস্তিত্ব জানান দেওয়ার পর্বে আছি আমরা। সরকার ও রাষ্ট্রীয় পর্যায়ে প্রতিনিধিত্বের দাবি সেখানেই অনেকটাই সুদূর পরাহত।
বাংলাদেশে প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর রাজনৈতিক অনুপস্থিতি ও মহান জাতীয় সংসদে প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর কণ্ঠস্বরের আবশ্যকতা বিবেচনায় আমি গত সংসদ নির্বাচনে বগুড়া-৫ (শেরপুর-ধুনট) আসনে প্রার্থী হয়েছিলাম। গণতান্ত্রিক যুক্তফ্রন্টের সমর্থনে বাংলাদেশের কমিউনিস্ট পার্টি (সিপিবি) আমাকে ‘কাস্তে’ প্রতীকে মনোনয়ন দেয়। এখানে উল্লেখ করা ভালো, ২০১৮ সালে জাতীয় সংসদ নির্বাচনে বগুড়া-১ (সারিয়াকান্দি-সোনাতলা) প্রার্থী হতে বাম গণতান্ত্রিক জোটভুক্ত বাংলাদেশের বিপ্লবী ওয়ার্কার্স পার্টি হতে ‘কোদাল’ প্রতীকে মনোনয়ন নিয়েছিলাম। কিন্তু বগুড়ার দৈনিক করতোয়া পত্রিকার ‘অনগ্রসর জনগোষ্ঠীর হয়ে কথা বলতে সংসদে যেতে চান শিপন রবিদাস’ শীর্ষক সংবাদ প্রকাশ হওয়ার পর থেকেই লাগাতার হুমকি ও চাপের মুখে পড়েছিলাম।
এই যাত্রা আমাকে শেখিয়েছে যে, প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর কণ্ঠস্বর কেবল সামাজিক আন্দোলনের মাধ্যমেই নয়, রাজনৈতিক ক্ষমতায়নের মাধ্যমেই সংসদে পৌঁছাতে পারে। আর সেই লক্ষ্যেই আমার প্রার্থী হওয়ার সিদ্ধান্ত—ব্যক্তিগত স্বার্থ নয়, সামাজিক দায়িত্ব।
Related Reading
Frequently Asked Questions
What is ক ষমত র ক ন দ র?
ক ষমত র ক ন দ র is the main topic of this guide. The article explains the context, practical details, and next steps readers should understand.
Why does ক ষমত র ক ন দ র matter?
ক ষমত র ক ন দ র matters because readers are looking for a useful answer, not just a short summary. Good content should match search intent and help them decide what to do next.