রাষ্ট্রপতি মো. সাহাবুদ্দিনের পদত্যাগ: কী পেলেন, কী হারালেন?
Banglabeacon.com – র ষ ট রপত ম স হ – রাষ্ট্রপতি মো. সাহাবুদ্দিনকে ঘিরে নতুন করে শুরু হওয়া রাজনৈতিক আলোচনা বাংলাদেশের রাজনৈতিক অঙ্গনে এক ধরনের অপেক্ষার আবহ তৈরি করেছে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে পদত্যাগের গুঞ্জন, বঙ্গভবনের নীরবতা, সরকারের অস্পষ্ট অবস্থান, স্পিকারের বিদেশ সফর সংক্ষিপ্ত করে দেশে ফেরা এবং রাষ্ট্রপতির স্বাস্থ্যগত অবস্থা—সব মিলিয়ে রাজনৈতিক পর্যবেক্ষকরা এখন একটি গুরুত্বপূর্ণ মুহূর্তের অপেক্ষায়। যদিও রাষ্ট্রপতির পদত্যাগের বিষয়ে বৃহস্পতিবার পর্যন্ত কোনো আনুষ্ঠানিক ঘোষণা আসেনি, তবে ঘটনাপ্রবাহ ইঙ্গিত দিচ্ছে যে রাষ্ট্রীয় রাজনীতিতে আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায়ের সূচনা হতে পারে।
বিতর্কের মাঝেই দায়িত্ব গ্রহণ
২০২৩ সালের এপ্রিলে আওয়ামী লীগের মনোনয়নে বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায় রাষ্ট্রপতি নির্বাচিত হন মো. সাহাবুদ্দিন। মুক্তিযুদ্ধের চেতনায় বিশ্বাসী একজন রাজনীতিক, সাবেক জেলা জজ, দুর্নীতি দমন কমিশনের কমিশনার এবং দীর্ঘ রাজনৈতিক জীবনের অধিকারী এই ব্যক্তিকে রাষ্ট্রপতি হিসেবে বেছে নেওয়ার সময়ে ধারণা করা হয়েছিল, তিনি রাজনৈতিক অস্থিরতার সময়ে একটি ভারসাম্যপূর্ণ ভূমিকা পালন করবেন। কিন্তু বাস্তবতা ভিন্ন পথে এগিয়েছে।
বড় অর্জন হিসেবে সাংবিধানিক ধারাবাহিকতা উল্লেখ করা যায়। রাষ্ট্রপতি সাহাবুদ্দিনের সমর্থকেরা বলবেন, তার সবচেয়ে বড় অবদান ছিল রাষ্ট্রের সাংবিধানিক ধারাবাহিকতা বজায় রাখা। একদিকে ক্ষমতার পালাবদল, অন্যদিকে অন্তর্বর্তী সরকারের শপথ, পরে জাতীয় নির্বাচন এবং নির্বাচিত সরকারের কাছে শান্তিপূর্ণভাবে ক্ষমতা হস্তান্তরের পুরো প্রক্রিয়ায় তিনি রাষ্ট্রপতির দায়িত্বে বহাল ছিলেন। ২০২৬ সালের ফেব্রুয়ারিতে ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের পর প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান এবং নতুন মন্ত্রিসভাকে তিনিই শপথবাক্য পাঠ করান।
বিশ্বাসযোগ্যতার সংকট তৈরি করেছে একটি গুরুত্বপূর্ণ ঘটনা। এক সাক্ষাৎকারে তিনি বলেন, শেখ হাসিনার পদত্যাগের কোনো লিখিত বা দালিলিক প্রমাণ তার কাছে নেই।
বড় ক্ষতি হিসেবে বিশ্বাসযোগ্যতার সংকট উল্লেখ করা যায়। কয়েক মাস পর এক সাক্ষাৎকারে তিনি বলেন, শেখ হাসিনার পদত্যাগের কোনো লিখিত বা দালিলিক প্রমাণ তার কাছে নেই। একজন রাষ্ট্রপতির বক্তব্যে এমন অসামঞ্জস্য শুধু রাজনৈতিক বিতর্কই তৈরি করেনি; বরং রাষ্ট্রীয় নথি, সাংবিধানিক প্রক্রিয়া এবং রাষ্ট্রপতির দপ্তরের বিশ্বাসযোগ্যতা নিয়েও প্রশ্ন তুলেছে। এই একটি ঘটনাই তার পুরো মেয়াদের মূল্যায়নে সবচেয়ে বেশি আলোচিত বিষয় হয়ে উঠেছে।
স্বাস্থ্যও একটি বাস্তবতা
রাষ্ট্রপতির স্বাস্থ্যগত বিষয়টি উড়িয়ে দেওয়ার সুযোগ নেই। ২০২৩ সালে তার হৃদযন্ত্রে বাইপাস সার্জারি হয়। চলতি বছর যুক্তরাজ্যে গিয়ে এনজিওগ্রামের সময় আবারও একটি ধমনিতে গুরুতর ব্লক ধরা পড়ে এবং স্টেন্ট বসাতে হয়। গুঞ্জন, নীরবতা ও রাজনৈতিক বার্তা রাষ্ট্রপতির পদত্যাগের গুঞ্জনের মধ্যে জাতীয় সংসদের স্পিকারের বিদেশ সফর সংক্ষিপ্ত করে দেশে ফেরার সিদ্ধান্ত আলোচনায় নতুন মাত্রা যোগ করেছে।
সংবিধান অনুযায়ী রাষ্ট্রপতির পদত্যাগপত্র স্পিকারের কাছেই জমা দিতে হয় এবং পদ শূন্য হলে তিনিই ভারপ্রাপ্ত রাষ্ট্রপতির দায়িত্ব পালন করেন। একই সময়ে সরকারের মন্ত্রীদের সংযত প্রতিক্রিয়া, বঙ্গভবনের আনুষ্ঠানিক নীরবতা এবং রাষ্ট্রপতির প্রেস সচিবের মন্তব্য, ‘আপনার মতো আমিও খবরটি দেখছি। পুরো পরিস্থিতিকে আরও রহস্যময় করে তুলেছে।’ অন্যদিকে রাষ্ট্রপতি নিজেই একটি গণমাধ্যমকে পাঠানো বার্তায় তার বিরুদ্ধে প্রচারিত একটি ফোনালাপের খবরকে “কল্পনার বাইরে” বলে প্রত্যাখ্যান করেছেন।
রাজনীতির পরিবর্তিত সমীকরণ ত্রয়োদশ সংসদ নির্বাচনের পর দেশের রাজনৈতিক বাস্তবতা বদলে গেছে। বিএনপির নিরঙ্কুশ সংখ্যাগরিষ্ঠতা নতুন রাষ্ট্রপতি নির্বাচনের ক্ষেত্রেও দলটিকে প্রধান নিয়ামক করে তুলেছে। সংবিধান অনুযায়ী রাষ্ট্রপতির পদ শূন্য হলে ৯০ দিনের মধ্যে সংসদ সদস্যদের ভোটে নতুন রাষ্ট্রপতি নির্বাচিত হবেন।
ইতিহাস কীভাবে মনে রাখবে? একজন রাষ্ট্রপতির সাফল্য শুধু তিনি কতগুলো ফাইলে সই করেছেন, কতজন রাষ্ট্রদূতের পরিচয়পত্র গ্রহণ করেছেন কিংবা কতটি বিদেশ সফর করেছেন—এসব দিয়ে মূল্যায়িত হয় না। তার প্রকৃত মূল্যায়ন হয় সংকটের মুহূর্তে তার ভূমিকার মাধ্যমে। রাষ্ট্রপতি মো. সাহাবুদ্দিন শেষ পর্যন্ত পদত্যাগ করুন বা মেয়াদ পূর্ণ করুন—তার রাষ্ট্রপতিত্বের মূল্যায়ন এখনই শুরু হয়েছে। তিনি রাষ্ট্রের সর্বোচ্চ সাংবিধানিক পদে অধিষ্ঠিত হওয়ার সম্মান অর্জন করেছেন, কিন্তু সেই সম্মানের সঙ্গে যুক্ত হয়েছে বিতর্ক, প্রশ্ন এবং রাজনৈতিক চাপের দীর্ঘ ছায়া।
