জন্মশতবর্ষে সুকান্ত ভট্টাচার্য: কবিতায় আন্তর্জাতিক চেতনা
জন মশতবর ষ স ক ন ত - দীর্ঘদিন ধরেই সুকান্ত ভট্টাচার্যের কবিতা নিয়ে লেখার যে তাগিদ আমার মনে জমে আছে, তা নিয়ে চিন্তা করতে গিয়ে আমি এক বিষয় উপলব্ধি করেছি।
Table of Contents
সুকান্ত ভট্টাচার্যের কবিতায় আন্তর্জাতিক চেতনা: জন্মশতবর্ষে এক পুনর্মূল্যায়ন
Banglabeacon.com – জন মশতবর ষ স ক ন ত – দীর্ঘদিন ধরেই সুকান্ত ভট্টাচার্যের কবিতা নিয়ে লেখার যে তাগিদ আমার মনে জমে আছে, তা নিয়ে চিন্তা করতে গিয়ে আমি এক বিষয় উপলব্ধি করেছি। বর্তমান সময়ে পৃথিবীব্যাপী যে জীবনঘনিষ্ঠ চিন্তাচেতনার অবক্ষয় ঘটেছে, তার প্রভাব অত্যন্ত গভীর। সন্ত্রাস ও ফ্যাসিবাদের আত্মার পুনরুত্থান লক্ষ্য করা যাচ্ছে, এবং সেই ক্রূর মানসিকতা অস্ত্র হাতে নিয়ে ছুটে বেড়াচ্ছে সারা বিশ্বে। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ ও যুদ্ধোত্তর যুগের মানুষদের কাছে হিটলারের স্মৃতি আজো এতটাই স্পষ্ট, যেনো তারা এখনো সেই মহাযুদ্ধের আবহেই বাস করছে।
সেই সময়ে জন্মগ্রহণ করা কিশোর সুকান্ত সাম্রাজ্যবাদ ও ফ্যাসিবাদ বিরোধী আন্তর্জাতিক প্রতিরোধের পরিবেশে বিস্ময়ে অবাক হয়েছিলেন। তিনি দেখেছিলেন যে পৃথিবীব্যাপী এক নব জাগরণের সূত্রপাত ঘটেছে—যা একদিন সমগ্র পৃথিবীকে মুক্ত করবে। বিশ্বব্যাপী বুর্জোয়া উদারনৈতিক সাহিত্য ও সংস্কৃতির মধ্যে নতুন সংস্কৃতির খোঁজ পেয়ে সুকান্ত উল্লসিত হয়েছিলেন। বিশ্বযুদ্ধের আবহে তিনি আন্তর্জাতিক চেতনার অধিকারী হয়ে উঠেছিলেন বিশ্বনাগরিক হিসেবে। প্রতিবাদের ভাষায় উৎকৃষ্টতম কবিতা রচনা করে তিনি নবজাগরণের চেতনা সৃষ্টি করেছিলেন।
সমসাময়িক কবি ও সাহিত্যিকদের পাশে সুকান্ত
বাংলা সাহিত্যের সেই অবিস্মরণীয় বিস্ময়কর ঘটনায় সুকান্ত একা ছিলেন না। নতুন সংস্কৃতির অঙ্গনে তাঁর আগে এবং সমসাময়িকালে শক্তি সঞ্চয় করেছিলেন ম্যাক্সিম গোর্কি, মায়াকোভস্কি, লু স্যুন, সমর সেন, সুভাস মুখোপাধ্যায়, বীরেন্দ্র চট্টোপাধ্যায়, আহসান হাবীব প্রমুখ। ফ্যাসিবাদ বিরোধী চেতনাকে ধারণ করেছিলেন রবীন্দ্রনাথ এবং নজরুল। কিন্তু দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের আবহে মুক্ত মানুষের খোঁজে আন্তর্জাতিক চেতনার ফ্যাসিবাদ ও সাম্রাজ্যবাদ বিরোধী কণ্ঠ ছিলেন সুকান্ত।
আজকের বিশ্বের সাম্রাজ্যবাদী দেশগুলোর নগ্ন ফ্যাসিবাদী চক্রান্তের সময়ে তেমন প্রতিবাদী কণ্ঠ যথেষ্ট উচ্চকিত নয়। সময়ের দাবি থাকা সত্ত্বেও একজন ম্যাক্সিম গোর্কি, একজন লু স্যুন, একজন সুকান্তকে খুঁজে পাওয়া যায় না—এই প্রশ্নের মুখোমুখি হতেই সুকান্তের কবিতার আন্তর্জাতিক চেতনার নির্ঝরে অবগাহনের ইচ্ছা জাগে। সেই প্রবল ইচ্ছার ফলে আবার নতুন সংস্কৃতির নির্মাণ অগ্রসর হবে এবং বিশ্বের নিপীড়িত গণমানুষদের সাম্রাজ্যবাদ ও ফ্যাসিবাদের যাঁতাকল থেকে মুক্ত করার জন্য উদ্বেলিত হয়ে উঠবে আমাদের মন।
ঠিকানা কবিতা: আন্তর্জাতিক চেতনার প্রতীক
সুকান্ত ভট্টাচার্যের কবিতার আন্তর্জাতিক চেতনার কথা উল্লেখ করতে হলে প্রথমেই তাঁর ‘ঠিকানা’ কবিতাটি আলোচনা করতে হয়। ১৯৪৩ সালে সুকান্ত একবার পার্টি কর্মী বন্ধুদের আমন্ত্রণে চট্টগ্রাম এসেছিলেন। সুকান্তের কবিখ্যাতি ইতোমধ্যে চতুর্দিকে ছড়িয়ে পড়েছিল। বিশেষ করে চট্টগ্রামের তরুণদের মধ্যে সুকান্ত তখন বেশ জনপ্রিয় হয়ে উঠেছিলেন। এই তরুণ বন্ধুরা সুকান্তের সঙ্গে যোগাযোগ রক্ষার জন্য তাঁর ঠিকানা চেয়েছিলেন। তারই উত্তরে সুকান্ত ‘ঠিকানা’ নামক ঐতিহাসিক কবিতাটি লিখেছিলেন এবং চট্টগ্রামের এক সভায় তা পাঠ করেছিলেন।
সুকান্ত এই কবিতাটিতে নিজেকে স্বদেশের একজন মুক্তিকামী মানুষ হিসেবে চিহ্নিত করেন এবং পৃথিবীর সমস্ত মুক্তিকামী মানুষের সাথে তিনি যে এক অভিন্ন সত্তা, সে কথাটিই স্পষ্ট করে তোলেন। তিনি এ কবিতাটিতে নিজের কোনো পরিচয় দেওয়ার প্রয়োজন বোধ করেন নি। মুক্ত স্বদেশ এবং মুক্ত বিশ্বই যে তাঁর ঠিকানা এবং মুক্ত স্বাধীন মানুষই যে তাঁর সবচেয়ে বড় পরিচয়, কবিতাটির ছত্রে ছত্রে তার অনুরণন শোনা যায়।
ঠিকানা আমার চেয়েছ বন্ধু ঠিকানার সন্ধান আজও পাওনি? দুঃখ যে দিলে করব না অভিমান? ঠিকানা না হয় না নিলে বন্ধু পথে পথে বাস করি, কখনো গাছের তলতে কখনো পর্ণকুটির গৃহ। আমি যাযাবর কুড়ি পথের নুড়ি, হাজার জনতা যেখানে, সেখানে আমি প্রতিদিন ঘুরি, বন্ধু ঘরের খোঁজে পাই না তো পথ তাইতো পথের নুড়িতে গৃহবো মজবুত ইমারত।
মুক্তিকামী মানুষের ঠিকানা জানার কি প্রয়োজন আছে? এখানে খ্যাতির প্রশ্ন নয়, বৃহত্তর স্বার্থ এবং ত্যাগের প্রশ্ন। সমস্ত মানুষের সত্তার যার অস্তিত্ব, সে বস্তুতই পৃথিবীবাসী।
বন্ধু, আজকে আঘাত দিও না/ তোমাদের দেওয়া ক্ষতে/ আমার ঠিকানা খোঁজ কর শুধু/ সূর্যোদয়ের পথে।/ ইন্দোনেশিয়া, যুগোশ্লাভিয়া,/ রুশ ও চীনের কাছে/ আমার ঠিকানা বহুকাল ধরে/ জেনো গচ্ছিত আছে।
যেখানেই মুক্তিকামী মানুষ, সেখানেই তাঁর উপস্থিতি। তাই ইন্দোনেশিয়া, যুগোশ্লাভিয়া, রুশ, চীন এবং সমগ্র পৃথিবীর সংগ্রামী মানুষ এবং সর্বহারা বিপ্লবের পথ ধরেই তিনি পৃথিবীর পথের পথিক।
খবর কবিতা ও আন্তর্জাতিক চেতনার বিকাশ
ফরাসি বিপ্লবী মজুর অ. গ্যাঁ. পতিয়ে-এর ইনটারন্যাশানাল সঙ্গীত সম্বন্ধে মন্তব্য করতে গিয়ে লেনিন বলেছিলেন যে, ‘বিপ্লবী কবিতা লাখ লাখ শ্রমিকের মনকে উদ্বুদ্ধ করতে সাহায্য করে, তাদের মধ্যে ভ্রাতৃত্বের বন্ধন সৃষ্টি করে এবং তাদের স্বার্থ রক্ষার জন্য সংগ্রামের প্রস্তুতি গ্রহণ করতে সাহস দান করে। বহু ভাষাভাষি শ্রমিকগণ যদি এক স্থানে দাঁড়িয়ে এ সঙ্গীতটি বিভিন্ন ভাষাতেও গায়, এ সঙ্গীতটির অন্তর্নিহিত অর্থ ও সুর সমস্ত শ্রমিককেই এক বৃন্তে আবদ্ধ করে এবং তাঁরা সকলেই এক হয়ে যান।’ সুকান্তের ‘ঠিকানা’ কবিতারও সেই আন্তর্জাতিক চেতনাই যে পরিস্ফুটিত তা নিঃসন্দেহেই বলা যায়।
‘খবর’ কবিতা সুকান্তের আন্তর্জাতিক চেতনার আরো পরিচয় পাওয়া যায়। সাংবাদিকের ভূমিকায় কবি খবর পাচ্ছেন পৃথিবীর চতুর্দিক থেকে। দূরদৃষ্টিসম্পন্ন সাংবাদিক কবি অপেক্ষা করছেন চূড়ান্ত সংবাদের জন্য।
জ্বলে ওঠে কি স্তালিনগ্রাদের প্রতিরোধে,/ মহাত্মাজীর মুক্তিতে, প্যারিসে অভ্যুত্থানে?
আর এসব সংবাদ পেতে পেতে বিপ্লবী কবির মন স্বপ্নময় হয়ে ওঠে এবং তখনই ‘খবর’ কবিতাটি নিছক একটি সংবাদপত্রের খবর নয়, বরং পৃথিবীব্যাপী বিপ্লবী আন্দোলনের প্রতিফলন হিসেবে প্রতিভাত হয়।
Related Reading
Frequently Asked Questions
What is জন মশতবর ষ স ক ন ত?
জন মশতবর ষ স ক ন ত is the main topic of this guide. The article explains the context, practical details, and next steps readers should understand.
Why does জন মশতবর ষ স ক ন ত matter?
জন মশতবর ষ স ক ন ত matters because readers are looking for a useful answer, not just a short summary. Good content should match search intent and help them decide what to do next.