দুই রাষ্ট্রের মাঝে নীরব প্রশ্নচিহ্ন
দ ই র ষ ট র র – বাংলাদেশ ও ভারতের সীমান্তে প্রায় দুই দেশের মাঝখানে দাঁড়িয়ে আছেন ১১ জন মানুষ। তাদের মধ্যে একজন অন্তঃসত্ত্বা, চারটি শিশু আর একজন শারীরিক প্রতিবন্ধী। তিন দিনের বেশি সময় ধরে তারা বাংলাদেশে ঢুকতে পারছেন না, ভারতে ফিরতে পারছেন না। উন্মুক্ত আকাশের নিচে রোদ আর বৃষ্টি কাটছে তাদের জীবন।
এই ঘটনাটি স্মরণ করিয়ে দেয় সাহিত্যের কালজয়ী চরিত্র টোবা টেক সিংহকে। যে ব্যক্তি ভারত-পাকিস্তান বিভাজনের সময় রাষ্ট্রহীন হয়ে পড়েছিল। সাদাত হাসান মাণ্টোর পরিচিত গল্পের সেই নায়ক অসহায় মানুষের অবস্থা নিয়ে প্রতিদিন প্রশ্ন করত, “পাকিস্তান কুন জায়গা হ্যায়?”
সবচেয়ে বড় মানবাধিকার হলো অধিকার থাকার অধিকার।
টোবা টেক সিংহের সেই অবস্থা বর্তমানে পুনরায় ঘটছে। গত কয়েক মাসে হাজার দেড়েক বাংলাভাষীকে ভারতে গ্রেপ্তার করে বাংলাদেশে ঠেলে দেয়া হয়েছে। তাদের আটক করা হয়েছে প্রমাণ দেখাওয়ার জন্য। কিন্তু প্রতিটি মানুষ তাদের পরিচয় সম্পর্কে সন্দেহ করছে না বাংলাদেশ, যার জন্য কোনো আইন অনুসরণ করা হয়েছে না।
২০২৫ সালের জুনে ভারতের পশ্চিমবঙ্গ রাজ্যের বীরভূম জেলায় একজন অন্তঃসত্ত্বা ও তার ছেলেকে ভারতীয় সীমান্তরক্ষী বাহিনী (বিএসএফ) দিল্লিতে আটক করেছিল। পরে বাংলাদেশে ‘পুশ ইন’ করার পর তাদের চাঁপাইনবাবগঞ্জে গ্রেপ্তার করা হয়। কিন্তু তাদের স্বামীকে ফেরত নিয়ে আসা হয়নি। বিএসএফ নির্দেশ দিলেও নিয়ে ফেরানো হয়নি তাকে। তখন সোনালি একাই সন্তান জন্ম দিয়েছেন।
এখন মশালগাঁও সীমান্তে আটকে পড়েছে এই অসহায় ১১টি প্রাণ। তাদের মধ্যে প্রতিবন্ধী শিশুটির বাবা হয়তো বৃদ্ধ। দুই দেশের সীমার মাঝখানে তারা নিজেদের ‘পরিচয়ের লড়াইয়ে’ মাঠে ছেড়ে দেয়া হয়েছে। রাষ্ট্রের পতাকা ও সীমান্ত মানুষের শরীরে এত গভীর দাগ কাটে যে সেসব কখনো মিলিয়ে যায় না।
মানচিত্রের দাগ যখন রক্তে রূপ নেয়, তখন মানবতার সভ্যতা বিব্রত হয়। সীমান্তের দুই পাশের প্রশাসন কি আজও তাদের ‘প্রমাণের অঙ্কে’ ব্যস্ত? সামনে দাঁড়িয়ে আছে অসহায় ১১টি প্রাণ।
রাষ্ট্রহীনতার এই কাণ্ড নিয়ন্ত্রিত না হলে প্রতিটি বাস্তুচ্যুত নাগরিক ভবিষ্যতে ‘মানুষ’ না হয়ে হয়ে যেতে পারে ‘একটি সংখ্যা’। সভ্যতার নামে এই ব্যর্থতার বিরুদ্ধে নীরব কণ্ঠস্বর জাগবে। অসহায় মানুষগুলো বাস্তব জীবনের টোবা টেক সিংহ, যারা জীবন্ত অবস্থায় ইতিহাসের করুণ সাক্ষী হয়ে আছে।