দজ্জার হইর: একটি পুকুরের সাদামাটা গল্প
দজ জ র হইর - আইচ্চা, দাদা! হইর ইগা আঙ্গো ন নি? তাইলে আমরা মাছ দইত্তাম হারি না কিল্লাই?
Table of Contents
Banglabeacon.com – দজ জ র হইর – আইচ্চা, দাদা! হইর ইগা আঙ্গো ন নি? তাইলে আমরা মাছ দইত্তাম হারি না কিল্লাই?
ঘাটলার সিঁড়িতে বসে গায়ে সাবান ডলতে ডলতে বলে উঠল আল-আমিন। নাতির এমন প্রশ্নে চমকে উঠে নুরু মিয়া… কী উত্তর দিবে বুঝে উঠতে পারে না। তাই চুপ করে থাকে…। বৈশাখের পড়ন্ত দুপুর। বাড়ির সামনেই রাস্তার ওপাশে পুকুরটি। এ বাড়ির সবার কাছে পুকুরটি ‘দজ্জার হইর’ নামেই পরিচিত। ঘাটটা বাঁধাই করা। হয়তো এ কারণেই এ বাড়ির পুরুষরা তো তো বটেই, আশপাশের বাড়ির পুরুষরাও এই পুকুরেই গোসল করে। গ্রীষ্মকাল, অনেকটা শুকিয়ে গেছে, বাঁধানো ঘাটলার সিঁড়ির শেষ ধাপটা দেখা যাচ্ছে। সেখানে বসে গোসলের আগে প্রতিদিনের মতো মেছওয়াক করছিল নুরুমিয়া, সঙ্গে নাতি আল-আমিন। আজ একটু দেরি হয়ে গিয়েছে তার। দক্ষিণের ডগীতে গিয়েছিল, সয়াবিন ক্ষেতে ঔষধ দিতে… সব ক্ষেতে স্প্রে করতে করতে যোহরের ওয়াক্ত হয়ে গেছে। বাড়ি ফিরতে ফিরতে দুইটা…
মনটা তার বিষণ্ন, সয়াবিন গাছের পাতা খেয়ে ফেলছে পোকা। এবারও আশানুরূপ ফলন হবে না বোধহয়। আবাদের খরচও উঠে কি না যথেষ্ট সন্দেহ আছে… আল-আমিন আবারও বলে উঠে… গোসল তো কইত্তাম হারি, বাড়িত হানিও নিতাম হারি। শুধু মাছ এনা ধরন যা না…
বরি দি দইত্তো গেলে দইনের বাড়ির ফারুক কাগা আর হেতেনের বাপ গালাগালি করি উডাই দে… আল-আমিনের কথাগুলো পুকুরের পানির ঢেউয়ের মতো ধীরে ধীরে মিলিয়ে যায়। নুরু মিয়া তবুও কিছু বলে না, আনমনে শ্যাওলা ধরা পিচ্ছিল সিঁড়িতে পায়ের গোড়ালি ঘষতে থাকে। যদিও তার মনটা আরও খারাপ হয়ে যায়। ভেবেছিল এবারের সয়াবিনের ফলন ভালো হলে উত্তরের ডগীর অন্তত পাঁচ গণ্ডা জমি কট থেকে ছাড়ানোর ব্যবস্থা করবে! না পারলে পুকুরটা যদি…
নুরু মিয়ার ভাবনায় ছেদ পড়ে আল-আমিনের অনবরত কথায়। সে বিরক্ত বোধ করে… “ও দাদা, ফারুক কাগারে এককানা কই দিয়েন— আরে যানি বরি দি মাছ দইত্তো দেয়…” গোসল শেষে মাথা গামছা দিয়ে মুছতে মুছতে বলে ওঠে। হঠাৎ নুরু মিয়া রেগে ওঠে! জোরে ধমক দিয়ে বলে ওঠেন…
“তোর বাপেরে যাই ক”! দাদার কাছে আচমকা ধমক খেয়ে আল-আমিন দ্রুত ভেজা লুঙ্গি পাল্টিয়ে ফোপাতে ফোপাতে বাড়ির দিকে চলে যায়, দুই হাত দিয়ে চোখও মুছছিল! ঠিক ঐ সময় বাজার থেকে ফিরে বাড়িতে ঢুকছিল আনোয়ার। একটু দূর থেকেই দেখল আল-আমিনের বাড়ির ভিতরে চলে যাওয়া, বুঝলো কোনো একটা ঝামেলা হয়েছে; ডান দিকে তাকাতেই চোখাচুখি হলো নুরু মিয়ার সাথে। সংগত কারণেই দ্রুতই চোখ নামিয়ে সাইকেল থেকে নেমে বাড়ির ভিতরে ঢুকে গেল। বছর দুয়েক হলো— সে নুরু মিয়ার চোখে চোখ রেখে কথা বলতে পারে না। আনোয়ার, নুরু মিয়ার ছেলে, তিনবোনের একমাত্র ছোট ভাই, আল-আমিনের বাবা। জমিদারহাট বাজারে আনোয়ারে মুদি দোকান। মাদ্রাসাভিত্তিক কোনো কাজে তেমন আগ্রহ না থাকাতে, ফাজিল পরীক্ষার পরপরই মাত্র পঞ্চাশ হাজার টাকার পুঁজি দিয়ে নুরু মিয়া এই দোকানটা করে দেয়। এখন প্রায় তের বছর তার দোকনের বয়স। ভালোই চলছিল দোকানের ব্যবসা। আনোয়ার যখন দোকান শুরু করে, বাড়ির সামনের রাস্তাটা মাটির ছিল, আস্তে আস্তে মাটির কাঁচা রাস্তাটা প্রথমে সলিং হলো, একসময় পিচ ঢালা পাকাও হলো। এই রাস্তাটির সাথে কেমন একটা যোগসূত্র আছে তার দোকানের। দেখতে দেখতে ছোট্ট দোকনটি আকারে বেশ বড় হলো। খুচরো মুদি দোকানটি পাইকারি দোকানের আড়তে পরিণত হলো। এই দোকানের সাথে সিজনাল শস্যের রাখী ব্যবসাও শুরু করলো আনোয়ার। সেখানেও ভাগ্য সহায় হলো তার। অল্প ক-বছরেই বাজারের অন্যতম ব্যবসায়ী হিসাবে প্রতিষ্ঠিত হয়ে গেল সে। এরই মধ্যে নুরু মিয়া হাজিরহাটের মুন্সীবাড়ির মেয়ে রেহানার সাথে আনোয়ারের ধুমধাম করে বিয়ে দেয়। তাদেরই প্রথম সন্তান আল-আমিন, সাতে পড়ল তার বয়স। আল-আমিনের ছোট একটা বোনও আছে, নাম ফাতিহা, বয়স চার!
মেয়ের জন্মের খুশিতেই সবার ব্যবহারের জন্যে দরজার পুকুরের রাস্তার পাড়ে দশটা সিঁড়িসহ একটা পাকা ঘটলা করে দেয় আনোয়ার। এই ঘটলাটাই এ পাড়ার মানুষের সারাদিনের অলস সময়ের আড্ডাস্থল হয়ে ওঠে। বেশ চলছিল আনোয়ার আর তার পরিবারের! তবে প্রত্যেক ছন্দেরই পতন ঘটে বোধহয়, হয় সুখেরও অসুখ। যার সূত্রপাত সেই পুকরের ঘটলায়! গেল বছরের আগের বছর আমন ঘরে ওঠার পর এলাকায় উত্তাপ ছড়াচ্ছিল ইউনিয়ন পরিষদের নির্বাচন। একদিন এ নিয়ে পড়ন্ত দুপুরে দরজার পুকুরের ঘটলায় তুমুল আড্ডা। হঠাৎ পাশের বাড়ির একজন আনোয়ারকে বলল— “ভাই, আন্নে এইবার মেম্বরির লাই খাড়াই যান!” সেদিন আনোয়ার না না বললেও তার মনের ভিতর শান্ত নদীতে আচমকা একটা বিরাট ঢেউ তৈরি হলো। সেই ঢেউ মনের দু-কূল প্লাবিত হলে আনোয়ারও গোপন ইচ্ছে পুষতে শুরু করল। এই সমাজেরও এটা একটা রোগ মনে হয় আজকাল, কারো হাতে কিছু টাকা হলেই তারা ক্ষমতা চায়— যার যার জায়গা থেকেই। যাইহোক, আনোয়ারের মেম্বার হওয়ার ইচ্ছের আগুনে চারপাশের কিছু বর্ণচোরা মানুষ মুখে ঘি-মাখন ঢালতে শুরু করল এবং তাদের বেশিরভাগই তার দোকানের বাকি খাওয়া ক্রেতা। আনোয়ারও স্বপ্ন দেখতে লাগল, অতঃপর স্বপ্ন ছোঁয়ার আশায় বিপুল উৎসাহে আরও তিনজন প্রতিদ্বন্দ্বির সাথে ইউপি নির্বাচনে চরবাদাম ইউনিয়নের ২ নং ওয়ার্ডের মেম্বার প্রার্থীর নমিনেশন দাখিল করল। ইদানীং মেম্বারের নির্বাচনেও লক্ষ লক্ষ টাকা খরচ হয়ে যায়। আনোয়ারেরও হলো, নির্বাচনের দিন আসতে না আসতেই নগদ ও ধারে যা ছিল শেষ। এদিকে নির্বাচনের শেষ মুহূর্তে বিবিধ খরচের জন্যে আরও টাকা চাই, আর গ্রামে টাকা যোগাড়ের একটাই সহজ উপায়— জমি বন্ধক বা গ্রাম্য ভাষায় যাকে বলে জমি কট দেয়া। ঐ মুহূর্তে টাকা দেয়ার মতো একজনই ছিল, সদ্য বিদেশফেরত দক্ষিণের বাড়ির কাদের মুন্সির ছেলে ফারুক। যে ফারুককে বিদেশ পাঠাতে কাদের মুন্সি আনোয়ায়ের কাছে এক কানি জমি কট রেখেছিল বেশ ক-বছর আগে। নুরু মিয়ার অগোচরে আনোয়ার উত্তরের ডগীর সকল জমির দলিল নিয়ে নিরুপায় হয়ে ফারুকের কাছে যায়। ফারুক টাকা দিতে রাজি হয়, প্রয়োজনীয় টাকার সাথে সাথে দেয় তার বাড়ির দশ ভোটের নিশ্চয়তাও। শর্ত শুধু একটা— উত্তরের ডগীর জমির সাথে টাকা ফেরত দেয়ার আগ পর্যন্ত দরজার পুকুরে মাছ চাষ করতে দিতে হবে। মেম্বার হওয়ার স্বপ্ন তখন আনোয়ারের চোখে-মুখে, রাজি হয়ে যায় শর্তে। ভুলে যায় বহু বছর আগে দরজার পুকুরে চুরি করে মাছ ধরার দায়ে মানুষের সামনে ফারুককে কান ধরে উঠ-বস করানো হয়েছিল…
আনোয়ারের ব্যবসায়িক বুদ্ধি ভালো থাকলেও, এলাকার পলিটিক্স সম্বন্ধে তেমন কোন ধারণা ছিল বলে মনে হয় না। ঐ নির্বাচনে সে মাত্র নয় ভোটে হেরেছিল! এদিকে পুঁজিতে ভাটা পড়ায় ব্যবসার অবস্থাও ভালো যাচ্ছে না! পুঁজির একটা অংশ বাকিতে মানুষের পেটে, আদায় হচ্ছে না। বাকিতে খাওয়া মানুষগুলো এখন অন্য দোকানের নগদ ক্রেতা!
তারা আনোয়ারের দোকান এড়িয়েই চলে, পাছে বাকির টাকা চেয়ে বসে। ওদিকে টাকার বন্দোবস্ত করতে না পারায় উত্তরের ডগির জমি সাথে দরজার পুকুরটাও ছাড়ানো যায়নি। প্রিয় মোটর-সাইকেলটাও বিক্রি করে দিতে হয়েছিল। আনোয়ারের ব্যবসার মতো বাড়ির সামনের পাকা রাস্তাটাও অনেক খানা-খন্দে ভরে গেছে। সেই রাস্তায় এখন পুরনো জং ধরা বাই-সাইকেলটাই সঙ্গী এখন তার। তারপর থেকে আজকের মতোই বাপের চোখের সামনে পড়লে আনোয়ার মাথা নিচু করে পালিয়ে যেতে চায়। কখনো পারে, কখনো পারে না। নুরু মিয়ার গোসল শেষ হলেও ঘটলায় বসে থাকে। পেটে খিদে থাকলেও খাওয়ার ইচ্ছা হয় না আজ। তাকিয়ে থাকে পুকুরের পানির দিকে… নিচে সিঁড়ির কাছে পানিতে কিছু তেলাপিয়া মাছ এসে খলবল করছে, আবার পিঠ উল্টিয়ে চলে যাচ্ছে। নুরু মিয়া দেখছে, আর ভাবছে… পুকুরটা তার, পুকুরের মাছগুলো তার না!
মনে পড়ে যায় কত কষ্ট করেই না পুকুরের এই জমিটা কিনেছিল। আনোয়ারের মায়ের বালা দুইটাও বিক্রি করতে হয়েছিল! অজান্তেই চাপা দীর্ঘশ্বাস বেরিয়ে এসে মিলিয়ে যায় শূন্যে… দাদা…
ও দাদা, আইয়েন ভাত খাইতাম যাই… আন্নেরলাই ব্যাকে বই রইচে! আল-আমিনের ডাকে সম্বিত ফেরে, স্বাভাবিক হয় নুরু মিয়া। আস্তে আস্তে নাতিকে নিয়ে বাড়ির ভিতরে রওনা হয়। দাদার হাত ধরে যেতে যেতে আল-আমিন বলে…
আব্বায় কইচে, ফারুক কাগা আঙ্গো কাছে টিয়া হাইবো, হেল্লাই মাছ দইত্তো দে না। আন্নে চিন্তা কইরেন না দাদা, অ্যাই বড্ডা অই বিদ্যাশে যাই টিয়া কামাই করি এই দজ্জার হইর ইগা ফারুক কাগাত্তেন লই লমু। হিয়ার হর অ্যাই আর আন্নে মিলি নতুন করি মাছের হোনা হালামু, বরি দি তেলাপিয়া মাছ দরুম… সময় বয়ে যায়। গ্রীষ্মের পর বর্ষা আসে, আষাঢ় শেষে শ্রাবণ আসে। এই শ্রাবণে অতি বৃষ্টির সাথে পাশের খাল দিয়ে আসা মেঘনার জোয়ারের পানিতে রাস্তাসহ ডুবে যায় পুকুরটা, সাথে ভেসে যায় পুকুরের সব মাছ! মাঝে মাঝে এই দেশটাকে এই ‘দজ্জার হইর’ এর মতোই মনে হয়!
এ দেশের মানুষও প্রতিনিয়ত আল-আমিনদের প্রতীক্ষায় থাকে, মুক্তির আশায়… (লেখাটিতে কোথাও কোথাও লক্ষীপুরের আঞ্চলিক ভাষা ও স্থানীয়ভাবে ব্যবহৃত শব্দের প্রয়োগ করা হয়েছে)
Related Reading
Frequently Asked Questions
What is দজ জ র হইর?
দজ জ র হইর is the main topic of this guide. The article explains the context, practical details, and next steps readers should understand.
Why does দজ জ র হইর matter?
দজ জ র হইর matters because readers are looking for a useful answer, not just a short summary. Good content should match search intent and help them decide what to do next.