যে সমাজে ক্ষমতা নয়, অবদানই মর্যাদার ভিত্তি
Banglabeacon.com – উন নত সম জ আল ক ত – বিশ্বের ত্রিশটি দেশের নাগরিকের মতামত বিশ্লেষণ করে বৈশ্বিক অর্থনৈতিক সহযোগিতা ও উন্নয়ন সংস্থা (ওইসিডি) ২০২৩ সালে একটি স্পষ্ট চিত্র তুলে ধরেছে: জাতীয় সরকারের ওপর উচ্চ বা মাঝারি-উচ্চ আস্থার হার মাত্র ৩৯ শতাংশ। অর্থাৎ গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রের নাগরিকরা সরকারকে একটি প্রয়োজনীয় প্রতিষ্ঠান হিসেবে স্বীকার করলেও তার প্রতি অন্ধ আনুগত্য প্রদর্শন করেন না। তাদের আস্থা নির্ভর করে স্বচ্ছতা, জবাবদিহি, নাগরিকের কথা শোনার প্রবণতা এবং কাজের মানের ওপর। এই তথ্যটি বোঝায়, উন্নত গণতন্ত্রে রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানকে সম্মান করা এবং সেই প্রতিষ্ঠানে বসে থাকা ব্যক্তিকে অন্ধভাবে সম্মান করা—দুটি সম্পূর্ণ ভিন্ন বিষয়।
বিশ্বজুড়ে পেশাভিত্তিক আস্থার ধারাবাহিকতা
বাজার গবেষণা ও জনমত জরিপের বৈশ্বিক প্রতিষ্ঠান আইপসোস-এর ২০২৪ সালের গ্লোবাল ট্রাস্টওয়ার্দিনেস ইনডেক্স-এ ৩২টি দেশের মানুষের মতামত সংগ্রহ করা হয়েছিল। ফলাফলটি ধারাবাহিকভাবে একটি প্যাটার্ন দেখায়: যাদের কাজ সরাসরি মানুষের জীবন, জ্ঞান ও ভবিষ্যতের সঙ্গে জড়িত, তাদের প্রতি আস্থা সবচেয়ে বেশি। গড়ে ৫৮ শতাংশ মানুষ চিকিৎসকদের, ৫৬ শতাংশ বিজ্ঞানীদের এবং ৫৪ শতাংশ শিক্ষককে বিশ্বাসযোগ্য মনে করেন। সামরিক বাহিনীর সদস্যদের ক্ষেত্রে এই হার ৪৩ শতাংশ। অন্যদিকে রাজনীতিকদের ক্ষেত্রে আস্থার হার মাত্র ১৫ শতাংশ—একটি প্রতীকীভাবে নিচু সংখ্যা।
যুক্তরাষ্ট্রভিত্তিক বিশ্লেষণ ও ব্যবস্থাপনা পরামর্শক প্রতিষ্ঠান গ্যালাপ-এর ২০২৫ সালের জরিপেও একই ধরনের ফলাফল পাওয়া যায়। নার্সরা ৭৫ শতাংশ সমর্থন নিয়ে সবচেয়ে বিশ্বাসযোগ্য পেশার শীর্ষে অবস্থান করে। প্রাথমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষক ৬১ শতাংশ আস্থা পেয়েছেন; চিকিৎসক ও ফার্মাসিস্টরাও সংখ্যাগরিষ্ঠ মানুষের আস্থার অধিকারী। বিপরীতে লবিস্ট, কংগ্রেস সদস্য ও টেলিভিশন সাংবাদিকদের অবস্থান তালিকার নিচের দিকে।
বাংলাদেশের স্থানীয় বাস্তবতা: একটি ফেসবুক পেজ থেকে শুরু
দেশের উত্তরাঞ্চলের একটি উপজেলার ফেসবুক পেজে সাম্প্রতিক সময়ে ‘আলোকিত সন্তান’দের তালিকা প্রকাশিত হয়েছে। তালিকায় জীবিত ব্যক্তিদের নাম রাখা হয়েছে। চোখে পড়ার মতো বিষয় হলো, সরকারি কর্মকর্তাদের নামই তালিকার ওপরের দিকে বেশি জায়গা দখল করেছে। ঘটনাটি প্রথম দৃষ্টিতে একটি সাধারণ স্থানীয় তালিকা তৈরির ব্যাপার মনে হতে পারে। তবে গভীরে তাকালে এটি বাংলাদেশের সমাজে মর্যাদা নির্ধারণের একটি বড় প্রশ্ন সামনে আনে: আমরা কাকে ‘আলোকিত মানুষ’ বলি? যার হাতে ক্ষমতা বেশি, নাকি যার অবদান বেশি?
ঔপনিবেশিক ঐতিহ্যের সামাজিক মনস্তত্ত্ব
বাংলাদেশে চিত্র ভিন্ন হওয়ার পেছনে ইতিহাস আছে। উপমহাদেশের প্রশাসনিক কাঠামো ঔপনিবেশিক শাসন থেকে উত্তরাধিকারসূত্রে এমন একটি সংস্কৃতি পেয়েছে, যেখানে সরকারি কর্মকর্তা ছিলেন রাষ্ট্রের ক্ষমতার দৃশ্যমান প্রতিনিধি। স্বাধীনতার পর গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রব্যবস্থা তৈরি হলেও সেই সামাজিক মনস্তত্ত্ব পুরোপুরি বদলায়নি। ফলে অনেক ক্ষেত্রে পদটি মানুষকে মর্যাদা দেয়; মানুষটি তার কাজের ভিত্তিতে পদকে মর্যাদা দেয়—এমন ধারণা এখনও দুর্বল। বিশেষ করে সচিব, ডিসি, ইউএনও, পুলিশ কর্মকর্তা, সামরিক কর্মকর্তা কিংবা অন্য কোনো উচ্চপদস্থ সরকারি কর্মকর্তার পরিচয় একজন ব্যক্তির সামাজিক অবস্থানকে দ্রুত বদলে দিতে পারে।
‘ক্ষমতাবান’ ও ‘আলোকিত’—দুটি ভিন্ন শব্দ
একজন নেতা অত্যন্ত প্রভাবশালী হতে পারেন। মানুষ তার কাছে যেতে চাইতে পারে, তার সঙ্গে ছবি তুলতে চাইতে পারে, তার সুপারিশ গুরুত্বপূর্ণ হতে পারে। কিন্তু তার অর্থ এই নয় যে মানুষ তার নৈতিকতা, সততা বা সিদ্ধান্তকে সমানভাবে বিশ্বাস করে। এখানেই ‘ক্ষমতাবান’ ও ‘আলোকিত’ শব্দ দুটির পার্থক্য নিহিত।
উন্নত সমাজে একজন মানুষের মর্যাদা অনেকাংশে নির্ধারিত হয় তিনি মানুষের জন্য কী করছেন—তার ভিত্তিতে।
শিক্ষক, গবেষক, লেখকের অবস্থান কোথায়?
একজন বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষক হয়তো কোনো প্রশাসনিক ক্ষমতা রাখেন না। কিন্তু তিনি কয়েক হাজার শিক্ষার্থীর জীবন ও চিন্তা বদলে দিতে পারেন। একজন গবেষক হয়তো কোনো রাজনৈতিক দলের নেতা নন। কিন্তু তার গবেষণা কৃষি, চিকিৎসা, জলবায়ু বা প্রযুক্তির ভবিষ্যৎ বদলে দিতে পারে। ক্ষমতা কখনই সম্মানের উৎস নয়। একইভাবে একজন কবি, বিজ্ঞানী, চিকিৎসক, শিক্ষক, সাংবাদিক, শিল্পী বা উদ্যোক্তার কৃতিত্বও একইভাবে মূল্যায়নের দাবি রাখে।
তালিকার সঠিক অর্থ কী হওয়া উচিত
‘আলোকিত সন্তান’ বললে পেশা নয়, অবদানই হওয়া উচিত প্রধান মাপকাঠি। কেউ কত বড় পদে আছেন, তার চেয়ে গুরুত্বপূর্ণ—তিনি কী সৃষ্টি করেছেন, কত মানুষের জীবন বদলেছেন, জ্ঞান বা সংস্কৃতিতে কী যোগ করেছেন, সমাজকে কতটা এগিয়ে নিয়েছেন এবং তার কাজ তার অনুপস্থিতির পরও কতদিন মানুষের উপকারে থাকবে।
কোনো উপজেলার ‘আলোকিত সন্তান’দের তালিকায় সরকারি কর্মকর্তা বেশি থাকতেই পারেন। তাদের অনেকেই নিঃসন্দেহে যোগ্য এবং সম্মানের দাবিদার। কিন্তু যদি তালিকাটি সত্যিই ‘আলোকিত সন্তান’-এর তালিকা হয়, তাহলে সেখানে প্রশাসনের পাশাপাশি শিক্ষক, চিকিৎসক, গবেষক, সাহিত্যিক, সাংবাদিক, শিল্পী, উদ্যোক্তা, ক্রীড়াবিদ ও সমাজকর্মীদেরও সমানভাবে খোঁজা দরকার। কারণ একটি জনপদের আলো শুধু তার প্রশাসনিক ভবন থেকে আসে না; আসে বিদ্যালয়ের শ্রেণিকক্ষ থেকে, হাসপাতালের ওয়ার্ড থেকে, গবেষণাগার থেকে, সংবাদকক্ষ থেকে, মঞ্চ থেকে, মাঠ থেকে, লেখকের টেবিল থেকেও।
শেষ পর্যন্ত একটি সমাজ কাকে সম্মান করে, তা সেই সমাজের মূল্যবোধের পরিচয় দেয়। ক্ষমতাবান সব সময়ই মর্যাদান নাও হতে পারেন। সেই দিন ‘আলোকিত সন্তান’ তালিকাও বদলে যাবে। সেখানে পদমর্যাদার পাশে জায়গা করে নেবে জ্ঞান, সৃজনশীলতা, সততা, মানবিকতা ও মানুষের জন্য রেখে যাওয়ার ইচ্ছা।
Related Reading
Frequently Asked Questions
What is উন নত সম জ আল ক ত?
উন নত সম জ আল ক ত is the main topic of this guide. The article explains the context, practical details, and next steps readers should understand.
Why does উন নত সম জ আল ক ত matter?
উন নত সম জ আল ক ত matters because readers are looking for a useful answer, not just a short summary. Good content should match search intent and help them decide what to do next.
