আবৃত্তিতন্ত্র আবৃত্তিমন্ত্র: কণ্ঠের বাইরে যে অন্বেষণ
আব ত ত তন ত র আব – বাংলা ভাষাভাষি সংস্কৃতিতে আবৃত্তি একটি স্বতন্ত্র শিল্প হিসেবে পরিচিত — মঞ্চে, প্রতিযোগিতায় এবং সাংস্কৃতিক আয়োজনে এর মূল্যবান স্থান রয়েছে। তবে তার অন্তর্গত তত্ত্ব, অনুশীলনপদ্ধতি এবং দর্শন নিয়ে আলোচনা খুব কম চোখে পড়ে। ফলে আবৃত্তি সাধারণত কৌশল নির্ভর একটি পরিবেশন শিল্পে সীমাবদ্ধ হয়।
এই সমস্যার মুখোপমুখী হয়ে লেখক কাজী মাহতাব সুমন প্রকাশ করেছেন একটি নতুন সংহতি। চার দশকের সময় ধরে আবৃত্তি সংক্রান্ত চর্চা এবং মঞ্চ অভিজ্ঞতা থেকে তিনি বিশেষ অনুভূতি সংগ্রহ করেছেন। তাঁর অভিজ্ঞতার একটি সম্পূর্ণ রূপ হিসেবে গ্রন্থটি সাজানো হয়েছে।
এক যৌথ ক্রিয়া হিসেবে আবৃত্তি
লেখকের মতে আবৃত্তি কেবল উচ্চারণ নয়; তা ভাষা, দেহ, শ্বাস ও চেতনার একটি যৌথ ক্রিয়া। কণ্ঠ মাধ্যমে পংক্তির অনুভবকে প্রকাশ করা হয় যেখানে শব্দের বিস্তার ধ্বনি থেকে উচ্চারণে পরিণত হয়।
নাদ কেবল শ্রুত ধ্বনি হিসেবে নয় — এটি এক অন্তঃস্থিত কম্পন। ধ্বনি থেকে উচ্চারণে সেই কম্পন ধারণ করে।
বইটি আবৃত্তিকে শারীরিক ও মানসিক অনুশীলনের একটি সমন্বিত প্রক্রিয়া হিসেবে দেখায়। শ্বাসের ব্যবহার কণ্ঠের গভীরতা, স্থায়িত্ব এবং নিয়ন্ত্রণের জন্য অপরিহার্য। এটি আবৃত্তির গুণগত মান নির্ধারণে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে।
আধ্যাত্মিক স্তরে আবৃত্তি
ওঙ্কার বা ‘ওঁ’ ধারণাটি বইটিকে একটি আধ্যাত্মিক স্তরে নিয়ে যায়। এটি ধ্বনির উৎস হিসেবে বিবেচিত হয়, যেখান থেকে সমস্ত শব্দের বিস্তার সম্ভব। বেদের বাক-বিভাগ — পরা, পশ্যন্তী, মধ্যমা ও ˆ বখরী — এই চারটি স্তর গ্রন্থের তাত্ত্বিক কাঠামোকে আরও সমৃদ্ধ করে।
বাক কেবল উচ্চারিত শব্দ নয়; এর একটি অদৃশ্য থেকে দৃশ্যে গমন করে। অনুভব থেকে প্রকাশে সেই যাত্রা অন্তর্নিহিত।
সংস্কৃতি ও মঞ্চের প্রকাশনা দিক থেকে বইটি সমালোচনা প্রাপ্ত করেছে। ‘জোড়া শালিক’ প্রকাশনার যত্নশীল প্রণয়ন গ্রন্থের নির্মাণভঙ্গি সুশৃঙ্খল ও পরিচ্ছন্ন। দেবজ্যোতি ঘোষ চৌধুরীর অঙ্কিত প্রচ্ছদ ভাব ও মেজাজকে দৃশ্যমানভাবে ধারণ করেছে।
সবশেষে বলা যায়, আবৃত্তিতন্ত্র আবৃত্তিমন্ত্র কেবল একটি বই নয়; এটি একটি আহ্বান। কণ্ঠের বাইরে যে অন্বেষণে এটি আসে। শব্দ কেবল উচ্চারণ নয়, শ্বাস কেবল বায়ু নয়, আর কণ্ঠ কেবল মাধ্যম নয়। সবকিছু মিলিয়ে এটি এক গভীর অনুশীলনের ক্ষেত্র।