হেমন্ত মুখোপাধ্যায়: বাংলাদেশে তাঁর শেষ সাক্ষাৎকার
হেমন্ত মুখোপাধ্যায়ের বাংলাদেশ-স্মৃতির শেষ অধ্যায়
Banglabeacon.com – হ মন ত ম খ প ধ - ১৯৮৯ সালের সেপ্টেম্বরের প্রথম সপ্তাহে ঢাকায় এসেছিলেন বাংলা গানের কিংবদন্তি হেমন্ত মুখোপাধ্যায়। ৬ থেকে ১৪ সেপ্টেম্বর পর্যন্ত তাঁর এই সফরটি পরবর্তীকালে বিশেষ তাৎপর্য পায়, কারণ এটিই ছিল বাংলাদেশে তাঁর শেষ উপস্থিতি। সঙ্গে ছিলেন স্ত্রী বেলা মুখোপাধ্যায়, কন্যা রানু মুখোপাধ্যায় এবং জামাতা গৌতম মুখোপাধ্যায়।
স্বাধীনতার পরপরই ১৯৭২ সালে প্রথমবার বাংলাদেশ সফর করেছিলেন তিনি। দীর্ঘ ১৭ বছর পর দ্বিতীয়বারের সফরটি তাই ছিল দুই বাংলার সাংস্কৃতিক যোগাযোগের এক আবেগঘন মুহূর্ত। কিন্তু ঢাকায় ফেরার মাত্র ১২ দিন পরে, ২৬ সেপ্টেম্বর ১৯৮৯ সালে, ৬৯ বছর বয়সে তাঁর মৃত্যু হয়।
বিটিভির স্মরণীয় আয়োজন
সেই সফরেই বাংলাদেশ টেলিভিশন হেমন্ত মুখোপাধ্যায়ের একটি দীর্ঘ সাক্ষাৎকার ধারণ করে। অনুষ্ঠানটির নাম ছিল ‘স্বরলিপি লেখা রবে’; উপস্থাপনায় ছিলেন কবি, গীতিকার, শিক্ষক ও টেলিভিশন ব্যক্তিত্ব ড. আবু হেনা মোস্তফা কামাল। আলাপচারিতাজুড়ে উপস্থাপক তাঁকে ‘হেমন্ত মুখার্জী’ নামে সম্বোধন করেছিলেন।
বিটিভির রজতজয়ন্তী উপলক্ষে শিল্পীর একটি শুভেচ্ছাবাণীও প্রচারিত হয়েছিল। ভবিষ্যতের প্রযুক্তিনির্ভর সম্প্রচারের সম্ভাবনা নিয়ে তিনি আশাবাদী ছিলেন। তাঁর বক্তব্য ছিল—
“একদিন আধুনিক যন্ত্রপাতি আসবে, ভবিষ্যতে সেরা প্রচার মাধ্যম হিসেবে বিটিভি পরিচিতি পাবে।”
মূল পরিকল্পনা ছিল ২৫ ডিসেম্বর বিটিভির ২৫ বছর পূর্তির অনুষ্ঠানমালায় সাক্ষাৎকারটি দেখানোর। পরে আকস্মিকভাবে ১৮ সেপ্টেম্বর সেটি সম্প্রচারের সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়। এই পরিবর্তনের কারণে ড. আবু হেনা মোস্তফা কামাল নিজের উপস্থাপিত অনুষ্ঠানটি দেখে যাওয়ার সুযোগ পান।
চারটি গানে এক সন্ধ্যার আবেশ
সাক্ষাৎকারে কথার পাশাপাশি গানও ছিল। হেমন্ত মুখোপাধ্যায় পরিবেশন করেছিলেন চারটি গান—‘নীল আকাশের নিচে এই পৃথিবী’, ‘সুরের আকাশে তুমি ওগো শুকতারা’, ‘মনে কি দ্বিধা রেখে গেলে’ এবং ‘আমার গানের স্বরলিপি লেখা রবে’। শেষোক্ত গানটির নামেই অনুষ্ঠানটির শিরোনাম নির্ধারিত হয়েছিল বলে এর আবহ আরও অর্থপূর্ণ হয়ে ওঠে।
নিজের পছন্দের গান জানতে চাইলে তিনি অল্প কথায় দুটি গানের নাম বলেছিলেন—‘মুছে যাওয়া দিনগুলি আমায় যে পিছু ডাকে’ এবং ‘সুরের আকাশে তুমি যে গো শুকতারা’। তাঁর সংযত উত্তর, শান্ত কণ্ঠ ও পরিমিত ভঙ্গি অনুষ্ঠানটিকে সাধারণ প্রশ্নোত্তরের সীমা ছাড়িয়ে এক আন্তরিক সাংস্কৃতিক বৈঠকে পরিণত করেছিল।
গানের জগতে আসার গল্প
হেমন্ত মুখোপাধ্যায় স্মরণ করেছিলেন নিজের শিল্পীজীবনের শুরু। একসময় তিনি ইঞ্জিনিয়ারিং পড়তেন; অবসরে ভালোবেসে গান করতেন। সেই শখের চর্চাকেই পেশাগত সংগীতজীবনের দিকে নিয়ে যান তাঁর বন্ধু, কবি সুভাষ মুখোপাধ্যায়। শিল্পীর ভাষায়, সুভাষ মুখোপাধ্যায়ই ছিলেন তাঁর সংগীতপথের গুরুত্বপূর্ণ সঙ্গী।
উপস্থাপক ড. আবু হেনা মোস্তফা কামাল তাঁর কণ্ঠের বৈশিষ্ট্য ব্যাখ্যা করতে গিয়ে পৌরুষ, কোমলতা এবং মাধুর্যের সমন্বয়ের কথা উল্লেখ করেছিলেন। এ প্রসঙ্গে হেমন্ত জানান, ১৯৩৫ সাল থেকে তিনি রেডিওতে গান গাইছেন এবং ১৯৪৫ সালে সংগীত পরিচালক হিসেবে কাজ শুরু করেন।
রবীন্দ্রসংগীতের সঙ্গে তাঁর প্রথম রেকর্ডিংয়ের কথাও উঠে আসে সেই সন্ধ্যায়। তিনি জানান, ‘কেন পান্থ এ চঞ্চলতা’ এবং ‘আমার আর হবে না দেরি’ ছিল তাঁর প্রথম রেকর্ড করা রবীন্দ্রনাথের গান।
পছন্দের শিল্পী, প্রিয় গীতিকার ও উত্তম কুমার
এক প্রশ্নের উত্তরে হেমন্ত মুখোপাধ্যায় নিজের প্রিয় শিল্পী হিসেবে লতা মুঙ্গেশকরের নাম বলেন। প্রিয় গীতিকার ছিলেন গৌরীপ্রসন্ন মজুমদার। বাংলাদেশের কোনো শিল্পীর গান শোনা হয়েছে কি না—এমন প্রশ্নে তাঁর উত্তর ছিল ‘না’। উপস্থিত কিছু দর্শক সেই উত্তরে অসন্তুষ্ট হলেও তাঁর উত্তরটি ছিল সরল ও দ্বিধাহীন।
তাঁর গায়কীকে চলচ্চিত্রে সবচেয়ে যথাযথভাবে ব্যবহার করেছিলেন কে—এই প্রসঙ্গেও তিনি এক অনন্য স্মৃতি তুলে ধরেন। উত্তম কুমারের সঙ্গে কণ্ঠের স্বাভাবিক সাযুজ্যের কথা বলতে গিয়ে তিনি বলেন—
“আমার কণ্ঠের সবচেয়ে সার্থক ব্যবহার যিনি করেছেন, তিনি উত্তম কুমার। আমার গলার সাথে তাঁর কোনো পার্থক্য ছিল না। ‘হারানো সুর’ সিনেমায় রমা রমা ডাক আমার কণ্ঠই ছিল।”
গানকে জীবনের প্রধান পরিচয় করে তোলার পাঁচ দশক পূর্ণ করতে পারাকে তিনি সৌভাগ্য বলে মনে করেছিলেন। তাঁর দীর্ঘ কর্মজীবনের সেই উপলব্ধি বাংলা গানের ইতিহাসে তাঁর অবস্থানের কথাই মনে করিয়ে দেয়।
দুই প্রিয়জনের আকস্মিক বিদায়
১৯৮৯ সালের ওই সফরে হেমন্ত মুখোপাধ্যায় কিছু অপ্রীতিকর অভিজ্ঞতারও মুখোমুখি হয়েছিলেন। ‘রেঁনেসা সাংস্কৃতিক পরিষদ’-এর আমন্ত্রণে তিনি মাইকেল মধুসূদন পুরস্কার ’৮৯ গ্রহণ করতে ঢাকায় এসেছিলেন। আয়োজনের সঙ্গে যুক্ত জনৈক আজাদ যশোরীর অনাকাঙ্ক্ষিত আচরণ ও কর্মকাণ্ডের কারণে তাঁকে গ্রেপ্তার করা হয়েছিল।
সফরের পরপরই ঘটে যায় আরও বেদনাদায়ক ঘটনা। ২৩ সেপ্টেম্বর মৃত্যুবরণ করেন ড. আবু হেনা মোস্তফা কামাল। তখন তাঁর বয়স ৫৩ বছর; তিনি বাংলা একাডেমির মহাপরিচালক ছিলেন এবং এর আগে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের বাংলা সাহিত্যের অধ্যাপক হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। তিন দিন পর, ২৬ সেপ্টেম্বর, চলে যান হেমন্ত মুখোপাধ্যায়ও।
সাক্ষাৎকারের সময় দুজনের মধ্যেই এমন একটি অনুভব প্রকাশ পেয়েছিল যে, এটি হয়তো তাঁদের শেষ সাক্ষাৎ। পরবর্তী ঘটনাপ্রবাহ সেই কথাকে নির্মম বাস্তবতায় পরিণত করে। দুই বাংলার বাঙালির সাংস্কৃতিক স্মৃতিতে তাই অনুষ্ঠানটি শুধু একজন শিল্পীর সাক্ষাৎকার নয়; এটি একই সঙ্গে দুই বিশিষ্ট মানুষের শেষ আলাপের দলিল।
হেমন্তযুগের অনুরণন
হেমন্ত মুখোপাধ্যায়ের প্রয়াণের পর তাঁকে ঘিরে বাংলা সংস্কৃতিজগতে গভীর শোক নেমে এসেছিল। তাঁর কণ্ঠে আধুনিক গান, রবীন্দ্রসংগীত, চলচ্চিত্রের প্লেব্যাক ও সুরসৃষ্টির বিস্তৃত পরিসর বাংলা শ্রোতার বহু প্রজন্মকে স্পর্শ করেছে। শারদীয় আবহ, বিষণ্নতা, প্রেম, স্মৃতি ও নীরবতার সঙ্গে তাঁর কণ্ঠ যেন এক আলাদা আবেগের সম্পর্ক গড়ে তুলেছিল।
“শরতেই বাঙালির চোখে হেমন্তের অশ্রুশিশির। প্রায় অর্ধশতাব্দী বঙ্গের সুরের আকাশ ভরে রেখেছিল যার কিন্নরকণ্ঠ, সেই হেমন্ত মুখোপাধ্যায় চলে গেলেন। অবসান হলো সংগীত জগতের এক স্বর্ণযুগের— হেমন্তযুগের। কিন্তু অবিচ্ছিন্ন পাঁচটি দশক যাঁর গানের হাওয়ায় প্রাণের নিঃশ্বাস নিয়েছে আপামর বাঙালি, তাঁর ‘শেষ নিঃশ্বাস’ নেই।”
ঢাকার সেই শেষ সাক্ষাৎকার আজও তাই মূল্যবান। সেখানে আছে শিল্পী হেমন্তের আত্মকথন, তাঁর পছন্দ-অপছন্দ, সৃষ্টিশীল পথের স্মৃতি এবং কণ্ঠের আড়ালে থাকা বিনয়ী মানুষটির পরিচয়। একই সঙ্গে এটি বাংলাদেশের টেলিভিশন-ইতিহাসেরও এক অমলিন সাংস্কৃতিক মুহূর্ত।
Related Reading
Frequently Asked Questions
What is হ মন ত ম খ প ধ?হ মন ত ম খ প ধ is the main topic of this guide. The article explains the context, practical details, and next steps readers should understand.
Why does হ মন ত ম খ প ধ matter?হ মন ত ম খ প ধ matters because readers are looking for a useful answer, not just a short summary. Good content should match search intent and help them decide what to do next.