সিলেটের চা বাগানে হাজার বছরের ভাষার শেষ নিঃশ্বাস
Banglabeacon.com – হ জ র বছর র অস ট – মৌলভীবাজারের বর্মাছড়া চা বাগানে দুই বৃদ্ধা নারী এখনো সেই প্রাচীন ভাষায় কথা বলেন, যা বাংলাদেশে আর কেউ জানে না। ক্রিস্টিনা কেরকেট্টা (৭৫) ও ভেরোনিকা কেরকেট্টা (৮০) — এই দুই প্রবীণার মৃত্যুর পর থেকেই খারিয়া ভাষাটি বাংলাদেশ থেকে বিলুপ্ত হয়ে যাবে। হাজার বছরের ইতিহাস বহনকারী এই ভাষাটি আর টিকে থাকবে না।
ঐতিহাসিক পটভূমি ও আগমন
ব্রিটিশ শাসনামলে ভারতের বিভিন্ন অঞ্চল থেকে চা বাগানে শ্রমিক হিসেবে খারিয়া জনগোষ্ঠী বাংলাদেশে আসে। তারা মৌলভীবাজার, হবিগঞ্জ ও সিলেট জেলার চা বাগানগুলোতে স্থায়ীভাবে বসতি গড়ে তোলে। পূর্ব-মধ্য ভারতের অস্ট্রো-এশিয়াটিক আদিবাসী জাতিগোষ্ঠী হিসেবে খারিয়াদের ভাষা দক্ষিণ এশিয়ার অন্যতম প্রাচীন ভাষা।
ভাষাবিজ্ঞানী পল সিডওয়েলের গবেষণা অনুযায়ী, মুন্ডা ভাষাগুলো প্রায় চার হাজার বছর আগে দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়া থেকে ওড়িশা উপকূলে পৌঁছায়। এরপর খ্রিষ্টপূর্ব প্রায় দুই হাজার সালের দিকে বর্তমান ঝাড়খণ্ড-ছত্তিশগড়-ওড়িশা-পশ্চিমবঙ্গ অঞ্চলে খারিয়া ভাষার বিকাশ ঘটে।
সংখ্যা ও অবস্থা
বাংলাদেশে সিলেটের ৪১টি চা বাগান পল্লিতে আনুমানিক পাঁচ হাজার সাতশ খারিয়া মানুষ বাস করেন। কিন্তু তাদের মধ্যে ভাষাটি সাবলীলভাবে বলতে পারেন মাত্র দুজন। ভারতে চিত্র ভিন্ন — ২০১১ সালের জনগণনা অনুযায়ী দুধ, ঢেলকি ও হিল খারিয়া মিলিয়ে প্রায় চার লাখ ২০ হাজার মানুষ এই ভাষায় কথা বলেন।
বাংলাদেশের ২০২২ সালের আদমশুমারিতে খারিয়াদের সংখ্যা প্রায় তিন হাজার ৯৯ (বেসরকারি হিসাবে প্রায় ছয় হাজার)। নতুন প্রজন্ম বাংলা, সাদরি, হিন্দি বা স্থানীয় ভাষায় কথা বলায় মাতৃভাষার চর্চা প্রায় বন্ধ হয়ে এসেছে।
ভাষার বৈশিষ্ট্য ও সংরক্ষণের অভাব
খারিয়া ভাষায় নেই কোনো প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষা, পাঠ্যবই, সরকারি স্বীকৃতি বা লিখিত বর্ণমালা — এটি মূলত মৌখিক ভাষা। ভারতেও এর নিজস্ব লিপি নেই (ঝাড়খণ্ডে দেবনাগরী, ওড়িশায় ল্যাটিন লিপি ব্যবহৃত হয়)।
এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে ভারতের সঙ্গে সাংস্কৃতিক বিচ্ছিন্নতা, সংরক্ষণ উদ্যোগের অভাব, বৈষম্যের ভয়ে পরিচয় গোপন রাখার প্রবণতা এবং দারিদ্র্য-জীবিকার চাপ।
সামাজিক ও সাংস্কৃতিক জীবন
খারিয়া জনগোষ্ঠী তিনটি উপগোষ্ঠীতে বিভক্ত — পাহাড়ি (হিল) খারিয়া, দেলকি খারিয়া ও দুধ খারিয়া। এর মধ্যে দুধ খারিয়ারা সবচেয়ে শিক্ষিত। হিল খারিয়ারা নিজেদের ‘সাবর’ পরিচয় দেন, যদিও বহিরাগতরা তাদের ‘খারিয়া’ বলেন। তাদের মধ্যে গোলগো, ভুনিয়া, সান্দি, কেরকেট্টাসহ বহু গোত্র আছে, যার মধ্যে গোলগো সবচেয়ে প্রভাবশালী।
অধিকাংশ খারিয়া চা-শ্রমিক বা কৃষিজীবী, ধর্মে সনাতন ও খ্রিষ্টান (প্রায় ১৯:২০ অনুপাতে)। প্রধান উৎসব সারহুল — বসন্তে পালিত প্রকৃতি-কৃতজ্ঞতার এক উৎসব, শালফুলকে যাতে জীবন ও সমৃদ্ধির প্রতীক মানা হয়। তারা দক্ষ নৃত্যশিল্পী — হারিও, কিনভার, হালকা, কুধিং, জাধুরার মতো নাচে যুবক-যুবতীরা অংশ নেন।
ভারতের খারিয়া সম্প্রদায় থেকে উঠে এসেছেন লেখিকা রোজ কেরকেট্টা, স্বাধীনতা সংগ্রামী তেলাঙ্গা খারিয়া, হকি খেলোয়াড় জ্যোতি সুনীতা কুল্লু ও সালিমা তেতে।
খারিয়া ভাষা শুধু যোগাযোগের মাধ্যম নয় — হাজার বছরের ইতিহাস ও সংস্কৃতির জীবন্ত দলিল। দুই প্রবীণ নারীর স্মৃতিতেই টিকে আছে এর শেষ নিঃশ্বাস।
একটি ভাষার মৃত্যু মানে শুধু শব্দ হারানো নয়, একটি জনগোষ্ঠীর স্মৃতি-বিশ্বাস-গান-আত্মপরিচয়ের বিলুপ্তি। তাই এখনই দরকার সরকার, গবেষক ও সাংস্কৃতিক সংগঠনের সমন্বিত উদ্যোগ — যাতে খারিয়া পরিচয় বইয়ের পাতায় নয়, বেঁচে থাকে মানুষের মুখে, সুরে ও নাচে।
Related Reading
Frequently Asked Questions
What is হ জ র বছর র অস ট?
হ জ র বছর র অস ট is the main topic of this guide. The article explains the context, practical details, and next steps readers should understand.
Why does হ জ র বছর র অস ট matter?
হ জ র বছর র অস ট matters because readers are looking for a useful answer, not just a short summary. Good content should match search intent and help them decide what to do next.