প্রান্তিকের স্বপ্ন ভঙ্গের পরের রাজনীতি
প্রান্তিকের স্বপ্ন ভঙ্গের পরের রাজনীতি
Banglabeacon.com – প র ন ত ক র স - মানবিক ও বৈষম্যহীন সমাজের স্বপ্ন। সমতা ও সমদৃষ্টির এমন একটি সমাজ যেখানে সবাই সমান। পঞ্চাশ ও ষাটের দশকে জন্ম নেওয়া মানুষদের জন্য এই উপাদানগুলো ছিল স্বপ্নের মূল ভিত্তি। মুক্তিযুদ্ধোত্তর বাংলাদেশের সংবিধানে সমাজতন্ত্র যেভাবে মূলনীতি হিসেবে এসেছিল তা অযাচিত ছিল না। জনআকাঙ্ক্ষা কি অন্তর্ভুক্তিমূলক মানবিক সমাজের এজেন্ডা ছিল না? তখন ধর্ম যেমন রাজনীতিতে এসেছে, তখন উদ্যাম আকাঙ্ক্ষার স্রোতে সমতা, সাম্য ও মানবিকতা তরুণদের হৃদয়ে প্রবেশ করেছিল।
স্বাধীনতাতত্ত্বের বাংলাদেশের বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে ছাত্রলীগ খুব বেশি সুবিধা করতে পারেনি। তরুণদের আকাঙ্ক্ষার মানবিক সমাজ গড়ার জন্য সমাজতন্ত্র প্রতিষ্ঠার প্রত্যাশায় ছাত্ররা আস্থা রেখেছিল সমাজতন্ত্রকে ধারণ করা ছাত্র সংগঠনগুলোতে। সে কারণে 'ছাত্র ইউনিয়ন'-এর উপর আস্থা ছিল তরুণ শিক্ষার্থীদের। এরপর জাসদ ছাত্রলীগ, সারাদেশে তারুণদের বুকে ঝড় তোলে। সেই ঝড় কতটুকু ছাত্ররাজনীতির ময়দানকে ধুয়ে মুছে পরিষ্কার করতে পেরেছে—তা মূল্যায়ন না হয়ে ভিন্নভাবে করা যেতে পারে।
তরুণ সমাজের আকাঙ্ক্ষা
তবে গবেষণা গ্রন্থে প্রবেশ না করেই এটা বলা যায় যে স্বাধীন বাংলাদেশে তরুণ সমাজ সাম্য, মৈত্রী ও নায্যতাভিত্তিক একটি দেশ গড়তে চেয়েছিল। ইতিহাসের পাতার নীচে পঞ্চাশের শেষ অথবা ষাটের দশকের মাঝামাঝি পর্যন্ত যাদের জন্ম—তাদের জীবন অভিজ্ঞতা পাঠ করলেই সেই সত্য উন্মোচন করা সহজ। চব্বিশের জুলাই আন্দোলনে বৈষম্যহীন বাংলাদেশ গড়ার আকাঙ্ক্ষার কথা শুনে পঞ্চাশ-ষাটের দশকের অনেকেই অগ্রহ সহকারে আন্দোলনটিকে অনুসরণ ও সমর্থন করতে থাকেন।
আন্দোলনের শুরুতেই আমরা শুনতে পাই,
বঙ্গবন্ধুর বাংলায়, বৈষম্যের ঠাই নাই
—এমনকি
আমার সোনার বাংলায় বৈষম্যের ঠাই নাই
এসব স্লোগান বদ্ধ সমাজকে অনেকটা চমকে দেয়। নতুন করে চেঁচিয়ে ওঠে সাধারণ মানুষ, শিক্ষিত মধ্যবিত্ত স্বপ্নিক মানুষের দল। এবার কি তাহলে প্রকৃত অর্থে বৈষম্য নিরসন হতে যাচ্ছে? আশায় বুকে বাঁধে অনেক আবেগী, সহজ সরল নাগরিক।
আগল ভাঙার রাজনীতি
যৌবনে যারা বৈষম্যহীন সমাজ গড়ার স্বপ্ন দেখেছিলেন তারা অনেকেই ভেবেছিলেন সাম্যবাদী নজরুলের স্বপ্নের কাল বোশেখী বোধ হয় এলো।
অনেকেই জয়ধ্বনি
দেওয়া শুরু করলেন। কেউ উচ্চস্বরে কেউ নিম্ন স্বরে। দূর থেকে তারা
নৃত্য পাগল
তরুণদের আকাঙ্ক্ষা আন্তরিক কৌতুহলে পর্যবেক্ষণ শুরু করলেন রাজপথের দিকে তাকিয়ে। রাজপথেও নজরুলের গান চলছে।
তোরা সব জয়ধ্বনি কর/তোরা সব জয়ধ্বনি কর/ঐ নূতনের কেতন ওঠে কালবোশেখির ঝড়/তোরা সব জয়ধ্বনি কর/ আসল এবার অনাগত প্রলয়-নাচের নৃত্যপাগল/সিন্ধু-পারের সিংহ-দ্বারে ধমক হেনে ভাঙল আগল?
আগল তাহলে ভাঙতে যাচ্ছে। সাতচল্লিশ পূর্ব বিপ্লবীদের অনেকেই আগল ভাঙতে চেয়েছিলেন। সত্তর-আশির দশকের দ্বিমেরু বিশিষ্ট পৃথিবীতে দেশে দেশে আগল ভাঙার রাজনীতি দেখেছি আমরা। আগল শেষ পর্যন্ত ভাঙেনি। আগল ভাঙার রাজনীতিতে যারা নিবেদিত ছিলেন, তারা অনেকেই হতাশ হয়ে নিজের আদর্শের বিপরীত পথে হেঁটে হেঁটে হারিয়ে গেছেন আগল ভাঙার রাজনীতির প্রান্তর থেকে।
মধ্যবিত্তের পাগলত্ব ও গ্রাফিতি
চব্বিশের আন্দোলনের যারা পরিকল্পনা করেছিলেন তারা জানতেন মধ্যবিত্ত বাঙালি পাগল হয় আগল ভাঙার গানে। পরিকল্পনা যেভাবে করা উচিত ছিল ঠিক সেভাবেই করা হয়েছিল। হৃদয় হরণ করা গ্রাফিতি আঁকা হয়েছিল দেয়ালে দেয়ালে। মনে আছে এখনও, একটি ছোট গাছের ডালে কয়েকটি পাতা। পাতাগুলোতে লেখা ছিল
হিন্দু, মুসলিম, বৌদ্ধ, খ্রিস্টান, ক্ষুদ্র নৃ-গোষ্ঠি
। ডালের নিচে লেখা,
পাতা ছেঁড়া নিষেধ
—এই যে মহামিলনের, মহা সৌহার্দ্যের বার্তা দেয়ালে দেয়ালে একে দেওয়া হয়েছিলো সে বার্তা হৃদয় ছুঁয়ে গেছে।
এই আন্দোলনের গানগুলোর দিকে খেয়াল করুন, মোহিনী চৌধুরীর সেই অমর গান, মুক্তির মন্দির সোপান তলে কত প্রাণ হলো বলিদান। গানটি শুনলে হৃদয়ের কোনের নিস্প্রভ আগুন জ্বলে ওঠে।
কত বিপ্লবী বন্ধুর রক্তে রাঙা/বন্দীশালার ওই শিকল ভাঙা/তারা কি ফিরিবে আজ সু-প্রভাতে/যত তরুণ অরুণ গেছে অস্তাচলে/যারা স্বর্গগত তারা এখনও জানেন/স্বর্গের চেয়ে প্রিয় জন্মভূমি
। আহা, স্বর্গের চেয়েও প্রিয় জন্মভূমি।
নারী ও গণতন্ত্রের সংগ্রাম
এরকম সঙ্গীতের বাণী যখন দেশপ্রেমিক বাঙালির কর্ণকূহরে প্রবেশ করে তখন তাদের চোখ দিয়ে অশ্রু ঝরে না হলে তারা মিছিলে যায়। আন্দোলনের শুরুতে মধ্যবিত্ত প্রগতিকামী বাঙালি ভেবেছিল, চণ্ডিদাসের সেই অমর বাণী, আব্দুল হাকিমের অকৃত্রিম দেশপ্রেমের ধারাবাহিকতায় রবীন্দ্রনাথ, নজরুলের মানবধর্মের উত্থান হিসেবে হলো বুঝি আবার। নায্যতা ভিত্তিক, মানবিক সমাজ গড়ার প্রত্যাশা বুকে ধারণ করে ঢাকার দেয়ালে ম্লান হয়ে গেলেও এখনও গ্রাফিতে লেখা আছে,
বিপ্লব শেষে তুমিও যদি স্বৈরাচারী হয়ে যাও, বিপ্লব তোমার পিছু ছাড়বে না
।
কথাটি মিথ্যে মনে হয়নি। তখনো, এখনও এবং ভবিষ্যতেও মনে হবে না। নারী শিক্ষার্থীদের সঙ্গে নিয়ে, শুধু সঙ্গে নয় সামনে নিয়ে
এমন দেশটি কোথাও খুঁজে পাবে নাকো তুমি
কিংবা স্বাধীন বাংলা বেতার কেন্দ্রের
তীর হারা এই ঢেউয়ের সাগর পাড়ি দেবোরে
গান গিয়ে আকাশ বাতাস বিদীর্ণ করে দিয়েছিল মিছিলে মিছিলে।
এর পর বিস্ময় নিয়ে দেখা গেলো তীরে নৌকা ভেঙার পরপরই নারীদেরকে কারা যেনো পেছনে নিয়ে গেলো। ধীরে ধীরে নারী আবার অবরোধবাসিনী হয়ে গেলো প্রায় এবং তাদের স্বর নিচে নেমে এলো। আর গান! বাউলদের আখড়ায়, বাউল গানের আসরে আগুন ধরিয়ে দেওয়া হলো।
তীর হারা এই ঢেউয়ের সাগরের
মতো গান আর মিছিলে শুনা গেলোনা। গণতন্ত্রের মুক্তির জন্য যেদেশে সাতচল্লিশের পর থেকে আনন্দ শুরু হয়েছিল সে দেশে গণতন্ত্রের মুক্তি আন্দোলনের লড়াইকে আইসিইউতে পাঠিয়ে দেওয়া হলো। গণমাধ্যমগুলোতে আঘাত করা শুরু করা হলো। প্রথম আলো, ডেইলি স্টারসহ যারা ভিন্নমত পরিবেশন করতেন তাদের মুখ বন্ধ করার জন্য।
Related Reading
Frequently Asked Questions
What is প র ন ত ক র স?প র ন ত ক র স is the main topic of this guide. The article explains the context, practical details, and next steps readers should understand.
Why does প র ন ত ক র স matter?প র ন ত ক র স matters because readers are looking for a useful answer, not just a short summary. Good content should match search intent and help them decide what to do next.