তেলাপোকাদের ৩৬ দিনের গদি কাঁপানো আন্দোলন!
তেলাপোকা থেকে বিদ্রোহ: তরুণদের ৩৬ দিনের সংগ্রাম
Banglabeacon.com – ত ল প ক দ র ৩৬ - ভারতের সুপ্রিম কোর্টের এক বিতর্কিত মন্তব্যকে অপমান হিসেবে না নিয়ে, বরং নিজস্ব পরিচয় হিসেবে গড়ে তুলেছিল দেশের যুব সমাজ। 'ককরোচ জনতা পার্টি'র (সিজেপি) ব্যানারে তিন সপ্তাহ ও আট দিন ধরে চলা এই আন্দোলনের শেষে মোদি সরকার নতি স্বীকার করেছে। কেন্দ্রীয় শিক্ষামন্ত্রী ধর্মেন্দ্র প্রধান পদত্যাগ করেছেন। ২০২৬ সালের মে মাসে সুপ্রিম কোর্টের এক শুনানিতে বেকার তরুণদের 'ককরোচ' বলে উল্লেখ করা হয় বলে সামাজিক মাধ্যমে খবর ছড়ায়। বিচারপতি বেকার যুবকদের এইভাবে সম্বোধন করেছিলেন। মুহূর্তের মধ্যেই সেই খবর তরুণদের মধ্যে তীব্র ক্ষোভ তৈরি করে।
রাজনৈতিক যোগাযোগ বিশেষজ্ঞ অভিজিৎ দিপ সামাজিক মাধ্যমে ব্যঙ্গাত্মকভাবে 'ককরোচ জনতা পার্টি' নামে একটি প্ল্যাটফর্ম চালু করেন। তার বার্তা ছিল স্পষ্ট—যদি ক্ষমতাসীনরা আমাদের 'ককরোচ' ভাবে, তবে এই ককরোচ পরিচয় নিয়েই আমরা ব্যবস্থার বিরুদ্ধে দাঁড়াব। চাকরি প্রত্যাশীদের দীর্ঘদিনের জমে থাকা ক্ষোভ, পরীক্ষা বাতিল, প্রশ্নপত্র ফাঁস এবং শিক্ষাব্যবস্থার চরম সংকট এই প্রতীকের নিচে এসে একত্র হয়। তরুণরা নিজেদের ব্যঙ্গাত্মকভাবে 'ককরোচ' হিসেবে উপস্থাপন করেই সরকারের কাছে জবাবদিহিতা দাবি করেন।
যন্তর মন্তরে ৩৬ দিনের অবস্থান
আন্দোলনকারীদের প্রধান দাবি ছিল কেন্দ্রীয় শিক্ষামন্ত্রী ধর্মেন্দ্র প্রধানের পদত্যাগ। সম্প্রতি ভারতে মেডিকেল ভর্তি পরীক্ষার (নিট-ইউজি) প্রশ্নপত্র ফাঁসের কেলেঙ্কারি প্রকাশ্যে আসার পর থেকেই এই দাবি জোরালো হয়। শনিবার (২৫ জুলাই) পর্যন্ত যন্তর মন্তরে আন্দোলন ছিল টানা ৩৬ দিনের। দিল্লির কেন্দ্রস্থল এই স্থানটি দখল করে রেখেছিল হাজার হাজার তরুণ। প্রতিদিনই সেখানে জড়ো হতো শিক্ষার্থী, চাকরিপ্রার্থী ও সাধারণ মানুষ। পুলিশের মামলা, সেন্সরশিপের চেষ্টা—কিছুই দমাতে পারেনি তাদের।
"সরকার আমাদের দাবিগুলো মেনে নেওয়ার জন্য আমরা সব প্রতিবাদকারীকে বাড়িতে চলে যাওয়ার আহ্বান জানাচ্ছি।" — সিজেপির মুখপাত্র সৌরভ দাস
আন্তর্জাতিক প্রতিধ্বনি ও রাজনৈতিক সমর্থন
আন্দোলনের প্রভাব এতটাই প্রবল যে, সীমান্ত পারাপারে পাকিস্তানের সামাজিক মাধ্যমেও ছড়িয়ে পড়ে #CockroachJantaParty হ্যাশট্যাগ। পাকিস্তানের তরুণরাও তাদের নিজস্ব অর্থনৈতিক সংকট ও বেকারত্বের সাথে মিল খুঁজে পেয়ে এই আন্দোলনে সংহতি জানায়। আন্দোলন তীব্র হতেই বিরোধী দলগুলোর নজর কাড়ে এই তরুণদের জমায়েত। পশ্চিমবঙ্গের মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় প্রকাশ্যে 'ককরোচ' আন্দোলনে সংহতি জানান। রাহুল গান্ধীসহ একাধিক বিরোধী নেতা বেকারত্ব ও প্রশ্নপত্র ফাঁসের ইস্যুতে এই ব্যঙ্গাত্মক আন্দোলনকে সমর্থন জানান।
আন্দোলনের রূপকার অভিজিৎ দিপের মূল ধারণাকে ডিজিটাল প্ল্যাটফর্মে ছড়িয়ে দিতে সবচেয়ে বড় ভূমিকা রাখেন ধ্রুব রাঠী ও অন্যান্য ডিজিটাল কনটেন্ট ক্রিয়েটররা। ভিডিও, শর্টস এবং মিমের মাধ্যমে কোটি কোটি তরুণের কাছে পৌঁছে যায় আন্দোলনের বার্তা।
সরকারের প্রতিশ্রুতি ও ভবিষ্যৎ আলোচনা
সিজেপির মুখপাত্র সৌরভ দাস জানান, তাদের তিনটি প্রধান দাবি পূরণের আশ্বাস দিয়েছে সরকার। প্রথমত, শিক্ষামন্ত্রী ধর্মেন্দ্র প্রধানের পদত্যাগ (ইতিমধ্যেই কার্যকর), দ্বিতীয়ত, আন্দোলনকারীদের বিরুদ্ধে রুজু করা সব মামলা প্রত্যাহার আর তৃতীয়ত, নিট প্রশ্নফাঁসের ঘটনায় আত্মহত্যাকারী শিক্ষার্থীদের পরিবারকে ১ কোটি রুপি করে ক্ষতিপূরণ দেওয়া। সৌরভ দাস জানান, আগামী চার সপ্তাহের মধ্যে শিক্ষা সংস্কার ও পরীক্ষা ব্যবস্থা সংস্কার নিয়ে আরও এক দফা আলোচনা হবে। ওয়েবসাইট ব্লক করা কিংবা পুলিশি বাধার পরও দমে যায়নি এই 'ককরোচ' জোট।
রাজনৈতিক নেতা থেকে সাধারণ জনগণ—সবাই এখন অনুধাবন করছেন যে, রাষ্ট্র যাঁদের 'ক্ষতিকর বা অপ্রয়োজনীয়' ভেবে এড়িয়ে যেতে চেয়েছিল, তারাই আজ সরকারের ভিত নাড়িয়ে দেওয়ার ক্ষমতা রাখে। আন্দোলনকারীদের সমর্থন রাহুল গান্ধীর যে মন্তব্যে তাদের অপমান করা হয়েছিল, সেটিকেই প্রতিবাদের অস্ত্র বানিয়ে ৩৬ দিনে তারা প্রমাণ করে দিয়েছেন—যদি একটি গণতান্ত্রিক দেশে অর্থনৈতিক উন্নয়নের পাশাপাশি নাগরিকদের একটি বড় অংশ নিজেকে বঞ্চিত বা অনিরাপদ মনে করতে শুরু করে, তাহলে সেই অসন্তোষ একসময় রাজনৈতিক চ্যালেঞ্জে পরিণত হতে পারে। ইতিহাসে বিভিন্ন দেশে এমন উদাহরণ রয়েছে।
আন্দোলনকারীদের সমর্থন রাহুল গান্ধীর 'ককরোচ জনতা পার্টি' হতো এখন আনুষ্ঠানিক আন্দোলন প্রত্যাহার করলেও, ভারতের রাজনৈতিক ইতিহাসে এই ৩৬ দিন একটি অনন্য অধ্যায় হয়ে থাকবে। যেখানে এক অপমানই হয়ে উঠলো প্রতিবাদের সবচেয়ে বড় প্রতীক।