Banglabeacon
Fast mobile article powered by Nexiamath-SEO AMP.
AMP Article

উপন্যাসে নারীচরিত্র এবং মাহমুদুল হকের ‘জীবন আমার বোন’ | সংবাদ

Published July 23, 2026 · Updated July 23, 2026 · By Susan Brown - banglabeacon.com

Foto : Susan Brown - banglabeacon.com

মাহমুদুল হকের উপন্যাসে নারীচরিত্র ও খোকার জীবনকাহিনী

Banglabeacon.com – উপন য স ন র চর ত - মুক্তিসংগ্রামের ইতিহাসকে পটভূমি করে লেখা হলেও মাহমুদুল হকের 'জীবন আমার বোন' উপন্যাসের নাট্যচরিত্র দেশের পরিস্থিতি থেকে কিছুটা দূরে থাকে। যুদ্ধকে তিনি কেবল চলমান একটি প্রক্রিয়া হিসেবে দেখতে চেয়েছেন। মার্চ মাসের প্রথম থেকে সপ্তবিংশ তারিখ পর্যন্ত দেশের উত্তপ্ত অবস্থা উদ্বেগের সাথে অনুভব করেছেন জাহেদুল কবির খোকা। তবে নিজেকে বাঁচিয়ে চলার চেষ্টা করেছেন তিনি। সপ্তম মার্চ তারিখে রেসকোর্স ময়দানেও গিয়েছিলেন। এই সময়ে ব্যাংক থেকে টাকা তুলে রিকশায় করে ফুর্তিও করেছেন। নারী নিয়ে তিনি একজন সংবেদনশীল পুরুষ হিসেবে চিত্রিত হয়েছেন।

খোকাকে ঘিরে থাকা নারীচরিত্রসমূহ

এই উপন্যাসে খোকাকে কেন্দ্র করে বিভিন্ন নারীচরিত্র আবর্তিত হয়েছে। গ্রন্থের শিরোনামে উল্লিখিত ব্যক্তি হলেন খোকার পঞ্চদশী বোন রঞ্জু। এর পেছনে রয়েছে অকালে মৃত্যুবরণ করা দুই বোন অঞ্জু ও মঞ্জুর কথা। খোকার মায়ের স্মৃতিও এখানে বিদ্যমান। উপন্যাসজুড়ে তিন নারী বিশেষভাবে উজ্জ্বল হয়ে আছেন—নীলাভাবি, বেলী এবং লুলু চৌধুরী। রঞ্জু এবং যুদ্ধের প্রসঙ্গ বাদ দিলে এই তিন নারীর চরিত্রই কাহিনীর মূল আলোচ্য বিষয় হয়ে ওঠে।

দুজন চাকর ছাড়া ধানমণ্ডির বাসায় খোকার একমাত্র আপনজন হলেন ছোটবোন রঞ্জু। মাতা অকালে মারা গেছেন, পিতা রাওলপিন্ডিতে কর্মরত আছেন। খোকাকে ঘিরে রয়েছে তার অকালপ্রাপ্ত দুই বোনের স্মৃতি, যারা জলে ডুবে মারা গিয়েছিলেন।

বাঞ্ছারামপুরে মামাবাড়ির পুকুরের শান বাঁধানো ঘাটের শ্যাওলায় পা দিয়ে পানিতে পড়ে যাও অঞ্জু, মঞ্জু নামে তাকে ধরতে; বাঁচানো যায়নি দুজনের একজনকেও। রঞ্জু যেন মামাবাড়ির সেই আশ্চর্য শান্ত তিরতিরে পুকুর যার গভীর গোপন তলদেশে চিরকালের মতো ঘুমিয়ে আছে অঞ্জু আর মঞ্জু।

ভাইবোনের সম্পর্কের গভীরতা

রঞ্জু এবং খোকা পরস্পরের বেঁচে থাকার প্রেরণা। তাদের জীবনের উদ্বেগ, ভালোবাসা এবং নির্ভরতা পরস্পরকে কেন্দ্র করেই আবর্তিত হয়। বয়সের পার্থক্য সাত বছর হলেও তাদের সম্পর্ক অটুট এবং বন্ধুত্বপূর্ণ। তারা যখন একে অপরের সাথে কথা বলে, সেই আলাপে থাকে স্নেহ ও ভালোবাসাজাত বিচিত্র বাকসৌন্দর্য।

খোকা ভীষণ বোহেমিয়ান এবং স্বেচ্ছাচারী জীবনে অভ্যস্ত। তার দিনযাপনে যেটুকু রুটিন আছে, তা কেবল সহোদরা রঞ্জুর দিকে তাকিয়ে। রঞ্জু স্কুল শেষ করে উচ্চ মাধ্যমিকে ভর্তি হয়েছে। বয়সের তুলনায় চিন্তা ও আচরণে অনেক পরিণত। বছর দুই আগে মায়ের মৃত্যু তাকে ক্রমে ক্লান্ত ও দুর্বল করে তুলেছে। বন্ধুদের সাথে আড্ডা দেওয়া, শপিং করা, সিনেমায় যাওয়া—এসবের প্রতি তার কোনো আগ্রহ নেই। সংসারের কাজকর্ম তদারকি করে অবসরে সে গল্প ও উপন্যাস পড়ে। বাগান করার শখও আছে এই পঞ্চদশীর।

রঞ্জু ও খোকার খুনসুটি, নির্ঘুম রাতে স্নেহসিক্ত কথোপকথন এবং পরস্পরের ভালোমন্দে তীক্ষ্ণ নজরদারি ভাইবোনের সম্পর্কের গভীরতা নির্দেশ করে। নিম্নোক্ত বর্ণনাটি স্পষ্ট করে, সহোদরার প্রতি খোকার অকৃত্রিম বাৎসল্য-জারিত মনোভাব:

খুব সাবধানে নখের ধার মারতে থাকে খোকা ফাইলিং করে। খোকার মনে হয় এই তো সেই রঞ্জু, এ আমার কতো চেনা, রুপোর তোয়ালপরা ঝুমঝুমি বাজানো ছোট্টবেলার সেই রঞ্জু, মুরাদ একে চেনে না, কাব্যচর্চার ঘোরারোগ দিন দিন বানোয়াট করে তুলেছে তাকে। রঞ্জুর স্নিগ্ধ মুখের দিকে তাকিয়ে খোকা স্বস্তি পায়, সুস্থ হয়; এমন স্নিগ্ধ এমন নির্মল এমন নিষ্কলঙ্ক হতে পারে কেবল করুণাধারা।

রঞ্জুর মৃত্যু ও খোকার অনুভূতি

রঞ্জুর কোনো চাওয়া-পাওয়া ছিল না, কোনো অভিযোগও করত না। খোকা যখন নীলাভাবির বাড়িতে আড্ডা দিচ্ছিল, তখন পাক আর্মিরা অতর্কিত ঢাকা শহরে রাস্তায় রাস্তায় কামান ও মর্টার দিয়ে সাধারণ মানুষের ওপর ঝাঁপিয়ে পড়ে। কারফিউ জারি হয়। নিরুপায় খোকা দুই দিন বন্দি থেকে যখন ধানমণ্ডির বাসায় ফিরে যায়, ততক্ষণে ত্রাস ও আতঙ্কে বাকরুদ্ধ রঞ্জু।

বস্তুত খোকার অসতর্কতা ও খামখেয়ালিপনাই রঞ্জুকে মহাবিপত্তির দিকে নিয়ে যায়। আত্মীয়-স্বজন বারবার তাগাদা দেওয়ার সত্ত্বেও রঞ্জুকে কুমিল্লা বা বাঞ্ছারামপুর পাঠাননি সে। যুদ্ধের মুখে বোনকে বাসায় একা রেখে বেরিয়েছিল আড্ডা দিতে। বাড়ি ফিরে জনস্রোতের সঙ্গে শামিল হয়ে বুড়িগঙ্গা পারি দিয়ে রঞ্জুকে নিয়ে গাছের তলায় আশ্রয় নেয় খোকা। জ্বরে আক্রান্ত ও বাকশক্তিহীন রঞ্জু যখন গাছের নিচে শায়িত, তখন তুমুল ঝড় ও শিলাবৃষ্টি নামে।

রঞ্জুর পরিণতি সম্পর্কে খোকার ভাষ্য:

অচৈতন্যপ্রায় রঞ্জুকে গাছতলার শতরঞ্চির উপর ফেলে প্রাণঘাতী গুলিবৃষ্টির ভিতর হাজার হাজার নরনারীর মতো আমিও কি ঊর্ধ্বশ্বাসে ছুটে পালিয়েছিলাম, ভেবে পায় না খোকা; যেন একটা দুঃস্বপ্ন। মন থেকে সবকিছু মুছে ফেলতে চায় খোকা। এক লক্ষ চল্লিশ হাজার পায়ের তলায় পড়ে চিঁড়েচ্যাপ্টা হয়ে গিয়েছিল কি নিরঞ্জন রঞ্জু?

নীলাভাবি: খোকাকে আচ্ছন্ন করা নারী

এই উপন্যাসে খোকাকে আচ্ছন্ন করেছিল এক নারী, সে হলো নীলাভাবি। নীলাভাবি রাজীব ভাইয়ের দ্বিতীয় স্ত্রী। অসম বয়সের হলেও রাজীবের সাথে নীলার বিয়ে হয়েছিল প্রেম করে। খোকা একটু ফুরসত পেলেই ছুটে যায় এই নারীর আকর্ষণে। তার দৃষ্টিতে, পৃথিবীর সকল নীলাভাবীরাই এক একটি জ্বলন্ত কামকুণ্ডল, ফুটন্ত টগবগে আগ্নেয়গিরি, যার নিদারুণ লাভাস্রোত পীত ধবল কালো বাদামি রাশি রাশি খোকার দগ্ধাবশেষ গ্রাসণ খেয়ে চলে।

নীলাভাবির কাছে খোকা যায় এক দুর্নিবার তৃষ্ণা নিয়ে। সেখানে গিয়ে তার যেন তর সই না। নীলাভাবি স্নান করছে জেনে বিরক্ত হয়। নীলাভাবি বেরিয়ে এসে তার জন্য শরবত দিতে চাইলে খোকার মধ্যে অস্থিরতা ও উন্নাসিকতা ফুটে ওঠে।