রাতের অদৃশ্য আদালত ও মানুষের অপরাধের বৈচিত্র্য
Banglabeacon.com – র ত র র অদ শ য – সৃষ্টিকর্তা মানুষের জন্য এতগুলো আশ্চর্য সৃষ্টি করেছেন—সমুদ্র, আকাশ, প্রেম, স্মৃতি এবং বিস্মৃতি। কিন্তু তার ক্ষীণতম দুঃখে মানুষ তার প্রয়োজনীয় জিনিসগুলো হারিয়ে ফেলে। যেমন সুখের দিনে ঘুম আসে হাটুনী মতো, কিন্তু দুঃখের সময় হয়ে ওঠে দর্শনের জন্য বিশেষ সময়।
রাতের সময় তৈরি হয় এক অপরিচিত রাষ্ট্র। দিনের বিশ্বে সে কোনো মন্ত্রণালয় বা সংসদ নেই, কিন্তু গভীর নিশীথে সে নিঃশব্দে ক্ষমতা দখল করে। তখন পৃথিবীর সকল কম্পন নিভে যায়, যুক্তি প্রায় অপসারিত হয়ে যায়, আর মানুষের কল্পনা এক অদৃশ্য রাষ্ট্রের ক্ষমতা গ্রহণ করে।
অদৃশ্য বিচারসভার সত্যের কথা
সেই রাষ্ট্রে আইন অদ্ভুত মন্ত্র বহন করে। যে সন্দেহ হাজারটি সত্যের চেয়ে শক্তিশালী, যে অপবাদ হাজারটি অর্জনের চেয়ে দীর্ঘজীবী। আর একটি ভুল হয়ে ওঠে বোঝাবুঝির অস্ত্র। রাত্রি গভীরতর হতে হতে আদালতের কার্যক্রমও শুরু হয় যেন মহাবিশ্বের প্রতিটি কোনো দিনে শিক্ষার মুহূর্ত ঘটে।
মানুষের সবচেয়ে বড় যুদ্ধ কখনো অন্য মানুষের সঙ্গে নয়; সে নিজের ভেতরের অদৃশ্য প্রতিপক্ষের সঙ্গেই।
যে রাতে মানুষ নিদ্রায় থাকার কথা, সেই রাতে অদৃশ্য আদালতের বিচারক হয়ে ওঠে মানুষের কল্পনা। উকিল হয়ে ওঠে তার ভয়, সাক্ষী হয়ে ওঠে তার স্মৃতি, এবং অভিযুক্তও সে নিজেই। তখন মনে হয় অসংখ্য অদৃশ্য মানুষ তার অপরাধের দায় চাপাচ্ছে, যার অস্তিত্ব তার জানা নেই।
বর্তমান যুগে এই অদৃশ্য আদালতের বিচার তীব্রতর হয়েছে। সামাজিক যোগাযোগের জগতে মিথ্যা মুহূর্তে হাজার মানুষের দরজায় পৌঁছে যায়, অথচ সত্য তখনও বিশ্রাম করে যায় না। অপবাদ হয়ে ওঠে এক সামাজিক প্রযুক্তি, এক মানসিক অস্ত্র, যা আত্মবিশ্বাসকে নিঃশব্দে ক্ষয় করে।
অদৃশ্য আদালতে কোনো আপিলের সুযোগ নেই, কোনো জামিন ব্যবস্থা ও নেই। তখন ঘুম শুধু শারীরিক প্রয়োজন থাকে না; সে হয়ে ওঠে এক গভীর অস্তিত্ববাদী মুক্তি। শরীরের বিশ্রাম নয়, বরং চিন্তার অবসান হয় সেখানে।
মনে হয়, শান্তি কোনো বাহ্যিক অর্জন নয়। শান্তি হলো নিজের সীমাবদ্ধতাকে মেনে নেয়ার শিল্প, নিজের সত্যকে ধারণ করার সাহস এবং সমস্ত ভুল ব্যাখ্যার মধ্যেও নিজের আলো অক্ষুণ্ন রাখার ক্ষমতা। ধীরে ধীরে রাত ফুরোয় যখন বিচারক ক্লান্ত হন, অভিযোগকারীরা নীরব হয়ে যায়।
সেই নীরবতার গভীরে মানুষ আবার নতুন ভোরের জন্য নিজেকে প্রস্তুত করে। সম্ভবত জীবনের সবচেয়ে বড় প্রজ্ঞা এখানেই—সব প্রশ্নের উত্তর জানা নয়, কিন্তু কিছু প্রশ্নকে নিঃশব্দে ঘুমিয়ে যেতে দেয়ার মধ্যে।
লেখক: প্রভাষক, সমাজকর্ম, কচুয়া সরকারি ডিগ্রি কলেজ, চাঁদপুর
