Bangladesh

যখন বাধ্যতামূলক অবসরে যেতে হয় | সংবাদ

Techtaranga.com_1200x630_17847803075268_social

শক্তি আর সত্যের সংলাপ

Banglabeacon.com – যখন ব ধ যত ম লক অবসর – ছাদের দিকে তাকিয়ে চিৎ হয়ে শুয়ে তাহের ওয়াদ রাওয়াসি বললেন, ‘বন্ধুরা, এই পৃথিবীটা উল্টো দিকেই চলছে। তুমি আর মেহেইমিদ চাষি হতে চেয়েছিলে, কিন্তু সাহেব হয়ে গেলে। অন্যদিকে মাহজুব সাহেব হতে চেয়েছিল, কিন্তু সে চাষি হয়ে পড়ল।’

মাহজুবের স্বাস্থ্য এখন অনেক ভালো। আর হাঁপানির কথা আর তুলে ধরে না। যে দোহাই দিয়ে সে ফজরের নামাজ পড়তে মসজিদে যাওয়া বন্ধ করে দিয়েছিল। সে হাসতে হাসতে বলল, ‘আল্লাহ তোমাকে রক্ষা করুন। আমার সাধ্য থাকলে আমি পাশোনা চালিয়ে যেতাম। কেউ আমাকে ডিঙিয়ে যেতে পারত না। আমি গভর্নর বা মন্ত্রী হতাম।’

তাহের বললেন, ‘মন্ত্রী হওয়ার ব্যাপারটা তো খুব কঠিন কিছু নয়। শিশুর খেলার মতো সহজ। এখন যে কেউই মন্ত্রী হতে পারে। আল্লাহর কসম, বাকরির আওলাদ তুরেইফি যদি মন্ত্রী না হয়, তবে আমি আমার বাপের ছেলেই নই।’

মেহেইমিদ জিজ্ঞেস করল, ‘ওকে কোন মন্ত্রণালয় দেবে? মন্ত্রণালয় তো একটাও খালি নেই।’ তাহের উত্তর দিলেন, ‘ওর জন্য মন্ত্রণালয়ের সমস্যা নেই। ওকে দাতব্য সংস্থার মন্ত্রী, বা ফার্মেসির মন্ত্রী, বা লোকোমোটিভের মন্ত্রী এমনই কোনো এক আজগুবি বিষয়ক মন্ত্রী বানিয়ে দেবে। এমনটা তো আজকাল হয়েই থাকে।’

মাহজুব বলল, ‘তুরেইফি, ওয়ালাদ আল-বাকরি সমবায়টাও ঠিকমতো সামলাতে পারে না। ওকে বানাতে চাও মন্ত্রী!’

তাহের হাসলেন, ‘মন্ত্রীগিরি করতে কোনো যোগ্যতার দরকার পড়ে? ধাপ্পাবাজি করতে পারলে আর লোকজনকে ডাঁট দেখানো ছাড়া কী করে! এদের কাজই তো অনেক বড় কথা বলা আর ঘোড়ার আণ্ডা ভাজা। কেবল “জয় হোক” আর “জিন্দাবাদ” বললেই চলে। দেখো, কোন দল এখন শক্তিশালী আর সে দলে ঢুকে পড়ো। একটু বক্তৃতা করো, দলবাজি, আর গোপনে মাল ঢালো। দেখবে, তুমি একদিন সংসদ সদস্য হয়ে গেছ। তারপর আর কী—আরাম আর ক্ষমতা।’

মেহেইমিদ বলল, ‘সংসদে ঢোকার পর যদি তোমাকে মন্ত্রী না বানায়, তখন কী করবে?’ তাহের উত্তর দিলেন, ‘যদি আমাকে মন্ত্রী না বানায়, আল্লাহর কসম, আমি ওদের বিরুদ্ধে অভ্যুত্থান করব।’

মাহজুব জিজ্ঞেস করল, ‘তারপর?’ তাহের বললেন, ‘তারপর আর কী? এমনই তো। আরাম করে বসে থাকো। যা চাই, ঘণ্টা বাজাও, চলে আসবে। এসো অমুক। অমুক দূর হও। অমুক, তোমাকে পুলিশ সুপার করে দিলাম। অমুক, তুমি ইন্সপেক্টর-জেনারেল। অমুক, তুমি আমার কথা শুনছ না, জেলে যাও। অমুক, তোমার মুখ আর দেখতে চাই না। অমুক, তুমি দারুণ কাজের লোক। আমি যখন শেভ্রোলেট চেয়ে শহরের ভেতরে রাজপথ দিয়ে যেতে থাকব, তখন লোকজন চিৎকার করবে—তাহের ওয়াদ রাওয়াসি জিন্দাবাদ! তাহের ওয়াদ রাওয়াসির জয় হোক! যদি আমি গভর্নর-জেনারেল হয়ে যেতাম!’

মাহজুব হো হো করে হেসে বলল, ‘শয়তান তোমার ওপর আছর করুক, অমুক-তমুক নিপাত যাক!’

মেহেইমিদ বলল, ‘জানার জন্য বলছি, তোমার গাড়িটা শেভ্রোলেট হতো না। যে গাড়িতে চড়বে এর পাশে যদি শেভ্রোলেট দাঁড় করানো হয়, তবে ঘোড়ার পাশে গাধার মতো দেখাবে।’

তাহের বললেন, ‘আল্লাহ ছাড়া কোনো মাবুদ নেই। শেভ্রোলেটের থেকেও বড় কিছু আছে নাকি?’

মেহেইমিদ বলল, ‘হ্যা, অবশ্যই আছে।’ তাহের জিজ্ঞেস করলেন, ‘কত বড় সেটা?’ মেহেইমিদ বলল, ‘এত্ত বড়,’ এবং দু’হাত প্রসারিত করল। তাহের বললেন, ‘আল্লাহ সর্বশক্তিমান। আল্লাহ তোমাকে নিরাপদ রাখুন, যদি এমনই হয়, তবে ধরে নাও কাল থেকেই আমি প্রেসিডেন্সির প্রার্থী।’

তিন জনেই সেই দুপুরের বিশ্রামের সময়, সেই একই বঠকখানার, সেই একই খাটে চিৎ হয়ে শুয়ে হেসে উঠল। মেহেইমিদ বলল, ‘আহ, বন্ধু, আল্লাহর শুকরিয়া আদায় করো। গভর্নর আর মন্ত্রী—ওরা কী রকম আছে জানো? বরং তুমি ওদের সবার চেয়ে ভালো আছো। তোমার কোনো চিন্তা নেই, কেউ তোমার কাছে কিছু চাইতে আসে না, আর তুমিও কারো কাছে কিছু চাইতে যাও না।’

মাহজুব গভীর, বিষণ্ন একটা নিশ্বাস ফেলল। তাহের বললেন, ‘আল্লাহর কসম, তুমি ঠিক বলেছ। যখন জানো যে, রাতের খাবারের ব্যবস্থা আছে, আল্লাহ তোমাকে নিরাপদ রাখুন, পুলিশপ্রধান হওয়া বা সর্বাধিনায়ক হওয়ার আর কী এমন প্রয়োজন? সমস্যা তো তোমার, হে মেহেইমিদ। পাশোনা করে জীবনটা নষ্ট করে দিলে, দেশ বিদেশে সফর করে বেড়ালে, আর শেষপর্যন্ত খালি হাতে এই স্রষ্টার অভিসম্পাতপ্রাপ্ত ওয়াদ হামিদে ফিরে এলে। যেন ভুল করেই সাহেব হয়ে গিয়েছিলে। অনেক দিন যাবতই তোমার মনটা এই দুর্দশাগ্রস্ত গ্রামের চাষবাসে পড়ে রয়েছে।’

অপরাহ্নের বিশ্রামরত দাদার খাটে চিৎ হয়ে শুয়ে মেহেইমিদও একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলল। কিছুক্ষণ ভেবে সে বলল, ‘তোমরা যা বলছ, ঠিকই বলছ। মাহজুবেরই ওই পথে যাওয়া উচিত ছিল। তার উচ্চাকাঙ্ক্ষা ছিল, আছে। সে ক্ষমতা চায়। কিন্তু আমি চাই সত্য। ক্ষমতার সন্ধান করা আর সত্যের সন্ধানের মধ্যে কতটা যে তফাৎ।’

ওয়াদ রাওয়াসি বিদ্রুপ করে হেসে বলল, ‘মানে এই অভিশপ্ত ওয়াদ হামিদে তুমি চলে এসেছ—কারণ, এখানে সত্যকে পাবে! আল্লাহর কসম, ব্যাপারটা চরম হাস্যকর হবে!’

মাহজুব বলল, ‘এটা সত্যের ব্যাপার নয়, এটা বোকামির ফল। মেহেইমিদ আর আমি প্রাইমারি স্কুলে সহপাঠী ছিলাম। তোর, মনে আছে? আমি ছিলাম ক্লাসে সবচেয়ে মেধাবী। মেহেইমিদ ছিল অনেক পিছিয়ে। আমার আব্বা, আল্লাহ তাঁর আত্মাকে শান্তি দিন, বলেছিলেন, “ব্যস। আর স্কুল-টিস্কুলের দরকার নেই।” সেই বছর গম কাটার জন্য শ্রমিকের সমস্যা ছিল, আব্বা ফসল তোলাটা খুব কষ্টে পড়েছিলেন। তিনি বললেন, “এসো, সকলের মতো আমাদের সঙ্গে কাজে লেগে পড়।” মেহেইমিদের…

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *